
মাত্র ২০ মিনিট। এই অল্প সময়েই বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্স থেকে প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চুরি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এ ঘটনা। বিপুল অঙ্কের সম্পদ হাতছাড়া হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টো বাজারে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কীভাবে এত অল্প সময়ে একটি বড় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেদ করে এই বিপুল সম্পদ সরানো হলো, তা নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ।
ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবসের তদন্ত অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) গ্রিনিচ মান সময় রাত ৮টার পর হামলার কার্যক্রম শুরু হয়। প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে বাইন্যান্সের বিভিন্ন ওয়ালেট থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল সম্পদ সরিয়ে নেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণে ১০টি ব্লকচেইন থেকে প্রায় ৬৩৬ কোটি ডলারের সম্পদ সরানোর তথ্য উঠে এসেছে।
বাইন্যান্সের যেসব ওয়ালেট ব্যবহার করে গ্রাহকদের দৈনন্দিন লেনদেন পরিচালনা করা হতো, মূলত সেগুলোকে লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। প্রাথমিকভাবে বাইন্যান্স জানিয়েছিল, প্রতিষ্ঠানের এক প্রকৌশলীর ল্যাপটপ আক্রান্ত হওয়ার মাধ্যমে ঘটনার সূত্রপাত হতে পারে। তবে পরবর্তী বিশ্লেষণে লেনদেন অনুমোদনের প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, হামলাকারীরা বাইন্যান্সের ‘সাইনিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ বা লেনদেন অনুমোদনকারী ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ পেয়েছিল। সাধারণভাবে ক্রিপ্টোকারেন্সি ওয়ালেট থেকে অর্থ স্থানান্তরের জন্য নির্দিষ্ট অনুমোদন প্রয়োজন হয়। হামলাকারীরা সেই অনুমোদন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে বৈধ লেনদেনের মতো দেখিয়ে সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পায়।
বিষয়টি বোঝাতে বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা হলো, চোর সরাসরি ভল্টের চাবি চুরি করেনি; বরং ভল্ট থেকে অর্থ বের করার নির্দেশ দেওয়ার পুরো ব্যবস্থাটিই নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল। তবে বাইন্যান্সের চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত হামলার সব প্রযুক্তিগত ধাপ নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
এ ঘটনার পর গ্রাহকদের আশ্বস্ত করেছে বাইন্যান্স। প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিচার্ড টেং জানিয়েছেন, গ্রাহকদের সম্পদের নিরাপত্তা ও ক্ষতিপূরণের জন্য তাদের এক বিলিয়ন ডলারের SAFU তহবিল রয়েছে। এ তহবিলের পাশাপাশি কোম্পানির নিজস্ব অর্থ ব্যবহার করে গ্রাহকদের ক্ষতি পূরণ করা হবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
চুরি হওয়া অর্থের কতটা উদ্ধার হয়েছে?
হামলার পর চুরি হওয়া সম্পদের একটি বড় অংশ জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান। টিআরএম ল্যাবসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চুরি হওয়া অর্থের বড় একটি অংশ ছিল স্টেবলকয়েন। ইউএসডিটি ও ইউএসডিসির মতো স্টেবলকয়েনের ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট ওয়ালেটের সম্পদ অকার্যকর বা ফ্রিজ করতে পারে।
হামলার পর টেথার, সার্কেল, রিপল এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়ালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান চুরি হওয়া সম্পদের একটি বড় অংশ জব্দে সহযোগিতা করেছে। বাইন্যান্সের প্রাথমিক হিসাবেও প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দের কথা জানানো হয়েছে। তবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হিসাব ও জব্দের সময় বিবেচনায় মোট পরিমাণে পার্থক্য থাকতে পারে।
অন্যদিকে, বিটকয়েন ও ইথেরিয়ামের মতো বিকেন্দ্রীভূত ক্রিপ্টোকারেন্সি কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সরাসরি ফ্রিজ করা যায় না। ফলে এসব সম্পদ উদ্ধার করা তুলনামূলক কঠিন। টিআরএমের বিশ্লেষণে হামলাকারীদের নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজিটাল সম্পদ থাকার কথা বলা হয়েছে। সেগুলো বিভিন্ন ওয়ালেটে সরিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে পরিচয় ও লেনদেনের গতিপথ আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের সন্দেহ
এ হামলার পেছনে কারা রয়েছে, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি বাইন্যান্স। তবে ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস ও চেইনঅ্যানালাইসিসের মূল্যায়নে উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট হ্যাকার গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততার সন্দেহ করা হচ্ছে।
টিআরএম ল্যাবসের দাবি, বাইন্যান্সে হামলার কৌশলের সঙ্গে গত বছর বাইবিট ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জে সংঘটিত বড় ধরনের হ্যাকিংয়ের মিল রয়েছে। ওই হামলার জন্যও উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট হ্যাকারদের দায়ী করা হয়েছিল। তবে বাইন্যান্স এখনো নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
বাইন্যান্স জানিয়েছে, অপরাধীদের পরিচয় শনাক্ত এবং তাদের বিচারের আওতায় আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কাজ করছে তারা।
ক্রিপ্টো বাজারে উদ্বেগ
বাইন্যান্সে হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিটকয়েনের দাম ৪ শতাংশের বেশি কমে যায়। ইথেরিয়াম ও সোলানাসহ অন্যান্য বড় ক্রিপ্টোকারেন্সির দামেও পতন দেখা যায়। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
২০১৭ সালে চীনে প্রতিষ্ঠিত বাইন্যান্স বর্তমানে বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি। প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩০ কোটির বেশি বলে ধারণা করা হয়। ২০২৪ সালে বাইন্যান্স জানিয়েছিল, তাদের হেফাজতে থাকা সম্পদের পরিমাণ ১৬ হাজার কোটি ডলারের বেশি।
একটি বড় ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেদ করে এত বিপুল পরিমাণ সম্পদ সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা পুরো শিল্পের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু গ্রাহকের ওয়ালেট নিরাপদ রাখাই যথেষ্ট নয়; লেনদেন অনুমোদনের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাও সমানভাবে সুরক্ষিত রাখা জরুরি। সূত্র: রয়টার্স