
তেহরানে আবাসিক ভবনে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় ধ্বংস হয় পারিবারিক বাড়ি; সাত মাস পরও প্রতিদিন ধ্বংসস্তূপের কাছে ফিরে যান তিনি
প্রথম সন্তানের আগমনের অপেক্ষায় ছিলেন তরুণ দম্পতি। বিয়ের এক বছরও হয়নি। নতুন সংসার, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা আর একসঙ্গে জীবন গড়ার স্বপ্নে দিন কাটছিল তাঁদের। কিন্তু একটি বিমান হামলায় মুহূর্তেই সব শেষ হয়ে যায়। ইরানের রাজধানী তেহরানে আবাসিক ভবনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় স্ত্রীসহ পরিবারের ১২ সদস্যকে হারিয়েছেন হামেদ মিরজায়ি।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন তাঁর ২৬ বছর বয়সী স্ত্রী মুহাদ্দেসা। গত ৯ মার্চের ওই হামলার সাত মাস পরও স্বজন হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি হামেদ। বরং প্রতিদিনই ফিরে যান ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িটির কাছে। সেখানে দাঁড়িয়ে খুঁজে ফেরেন হারিয়ে যাওয়া পরিবার ও জীবনের স্মৃতি।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরায় ৩০ অক্টোবর প্রকাশিত ফাতেমেহ করিমখানের বিশেষ প্রতিবেদনে হামেদের এই হৃদয়বিদারক অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছে। নিজের বর্ণনায় হামেদ বলেন, বোমা হামলার পর সাত মাস পেরিয়ে গেলেও অনেক দিন ঘুম বা চেতনা ফিরে পাওয়ার পর নিজেকে আবার সেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দেখতে পান। মনে হয়, তিনি প্রিয়জনদের খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
হামেদের ভাষ্য অনুযায়ী, যে ভবনটিতে হামলা হয়েছিল, সেটি তাঁর দাদা ও বাবার চাচা যৌথভাবে তৈরি করেছিলেন। পরে ভবনের বিভিন্ন অ্যাপার্টমেন্ট পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। বিয়ের প্রায় এক বছর আগে স্ত্রী মুহাদ্দেসাকে নিয়ে ওই ভবনের একটি ফ্ল্যাটে সংসার শুরু করেন তিনি। সেখানেই তাঁদের প্রথম সন্তানের আগমনের প্রস্তুতি চলছিল।
হামেদ জানান, ৯ মার্চ দুপুরে তিনি কাজের জন্য বাড়ি থেকে বের হন। দুপুর আড়াইটার দিকে স্ত্রী তাঁকে বার্তা পাঠিয়ে ফেরার পথে মাথাব্যথার ওষুধ কিনে আনতে বলেন। কোন ওষুধ প্রয়োজন, তা জানতে স্ত্রীকে ফোন করেছিলেন তিনি। কিন্তু ফোন ব্যস্ত থাকায় কথা হয়নি। বাড়িতে অতিথি থাকায় তাঁদের ফোনেও যোগাযোগের চেষ্টা করেন। সেই ফোনও ব্যস্ত পান।
এর কিছুক্ষণ পর বাড়ি থেকে প্রায় পাঁচ মিনিটের দূরত্বে থাকতেই বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান হামেদ। প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রটি তখন আঘাত হেনেছে। বিস্ফোরণে মাটি কেঁপে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রী ও পরিবারের অন্য সদস্যদের ফোন করতে থাকেন তিনি। কিন্তু কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি।
প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারেননি যে তাঁদের বাড়িটিতে হামলা হয়েছে। তাঁর ধারণা ছিল, আশপাশের অন্য কোথাও ক্ষেপণাস্ত্র পড়েছে। কিন্তু বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে দেখেন, ভবনটির কাঠামো ছাড়া প্রায় সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। হামেদের বর্ণনা অনুযায়ী, প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রের পর আরও পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র ওই বাড়িতে আঘাত হানে।
ধ্বংসস্তূপের কাছে পৌঁছে স্ত্রীর কাছে যাওয়ার জন্য দোতলায় উঠতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সিঁড়ি ভেঙে পড়ে থাকায় ওপরে যাওয়ার পথ ছিল না। ভবনের কয়েকজন প্রতিবেশী ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছিলেন। তাঁদের উদ্ধারে সহায়তা করে রেড ক্রিসেন্ট।
হামেদ তখনো আশা ছাড়েননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, উদ্ধারকর্মীরা খোঁজ চালিয়ে গেলে পরিবারের কাউকে হয়তো জীবিত পাওয়া যাবে। কিন্তু সময় গড়ানোর সঙ্গে সেই আশা ফিকে হয়ে আসে। রাত নামার পরও পরিবারের ১২ সদস্যের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।
হামেদের স্ত্রী ছাড়াও ওই হামলায় নিহত হন তাঁর বাবা-মা, দাদা-দাদি, বোনের স্বামী ও তাঁদের মেয়ে, চাচা এবং পরিবারের আরও কয়েকজন সদস্য। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বাড়িতে অতিথি হিসেবে থাকা তাঁর স্ত্রীর বোনও। হামেদ জানান, হামলার পর টানা ২০ দিন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে স্বজনদের খুঁজেছেন তিনি। কিন্তু কাউকেই জীবিত পাননি।
একসময় যে বাড়িতে পরিবারের কয়েক প্রজন্ম একসঙ্গে বসবাস করতেন, সেই বাড়িই এখন তাঁর কাছে স্বজন হারানোর স্মৃতিচিহ্ন। হামেদ বলেন, তিনি একমাত্র সন্তান ছিলেন। ভাইবোন না থাকলেও বড় পরিবারের সঙ্গে জীবন কাটানোর স্বপ্ন ছিল তাঁর। এখন পরিবারের আর কেউ বেঁচে নেই।
হামলার সাত মাস পরও প্রতিদিন ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িটির কাছে ফিরে যান হামেদ। তাঁর মনে হয়, তাঁর জীবনটাও যেন ওই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। সেখানে ফিরে গিয়ে হারানো জীবনের কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়ার আশা করেন তিনি। কিন্তু প্রতিবারই ফিরে আসতে হয় শূন্য হাতে।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা,