১১:১৪ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় ধস, এক বছরে সর্বনিম্ন পর্যায়ে

Reporter Name
  • Update Time : ১০:৩০:১৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
  • / 5
Print

এক দিনে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে সোনার দাম, ৫০ ডলারের নিচে রূপা; প্রযুক্তি শেয়ারের পতনের প্রভাব ধাতুর বাজারেও

বিশ্ববাজারে স্বর্ণ ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামে বড় ধরনের পতন হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা না আসার আশঙ্কায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে দরপতন হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারেও। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) লেনদেনের একপর্যায়ে স্বর্ণের দাম গত এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। একই সময়ে রূপার দামও ১১ মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো আউন্সপ্রতি ৫০ ডলারের নিচে নেমেছে।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৮৮০ দশমিক ৯৭ ডলারে নেমে আসে। ২০২৫ সালের অক্টোবরের পর এটিই ছিল সর্বনিম্ন দর। প্রতি আউন্সে ৩১ দশমিক ১০৩৫ গ্রাম এবং এক ভরিতে প্রায় ১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম ধরে হিসাব করলে এই দরে এক ভরি খাঁটি স্বর্ণের আন্তর্জাতিক কাঁচামূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৪৫৫ ডলার। তবে এটি বাংলাদেশের বাজারে গয়নার বিক্রয়মূল্য নয়।

অন্যদিকে, একই দিনে স্পট মার্কেটে রূপার দাম ৬ দশমিক ৫ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪৯ ডলারে নেমে আসে। প্রায় ১১ মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো মূল্যবান এই ধাতুর দাম ৫০ ডলারের নিচে চলে গেল। প্লাটিনামের দাম ৪ দশমিক ২ শতাংশ কমে ১ হাজার ৪২৫ দশমিক ০২ ডলারে এবং প্যালাডিয়ামের দাম ৩ শতাংশ কমে ৯৭৬ দশমিক ০৮ ডলারে নেমে আসে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফিউচার মার্কেটেও স্বর্ণের দামে বড় পতন দেখা গেছে। ডিসেম্বর মাসে সরবরাহের জন্য স্বর্ণের ফিউচার মূল্য ৩ দশমিক ৩ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৩ হাজার ৮৯৮ দশমিক ৯০ ডলারে স্থির হয়।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা মুনাফা করতে পারবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে প্রযুক্তি খাতের শেয়ার বিক্রির চাপ বেড়েছে। শেয়ারবাজারে লোকসান সামাল দিতে অনেক বিনিয়োগকারী স্বর্ণের মতো নিরাপদ সম্পদও বিক্রি করছেন। এতে মূল্যবান ধাতুর বাজারে দরপতনের চাপ আরও বেড়েছে।

স্বাধীন ধাতু ব্যবসায়ী তাই ওং বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, ‘আকাশ যেন ভেঙে পড়ছে।’ তাঁর মতে, শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতনের প্রভাব থেকে ধাতুর বাজারও রেহাই পাচ্ছে না। এআই খাতের বাজার চাঙা থাকার পেছনে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এখন সেই আয়ের স্থায়িত্ব নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

জার্মান আর্থিক প্রতিষ্ঠান কোমার্জব্যাংকের বিশ্লেষকেরা এক নোটে জানিয়েছেন, প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে বড় ধরনের পতনের কারণে অনেক বিনিয়োগকারী লোকসান সামাল দিতে স্বর্ণের মতো সম্পদ বিক্রি করছেন। কেউ কেউ মার্জিন কলের মুখেও পড়ছেন। তবে তাঁদের ধারণা, মূল্যবান ধাতুর বাজারে শিগগিরই কিছুটা পুনরুদ্ধার দেখা যেতে পারে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৫ হাজার ৫৯৫ ডলারের রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। সেখান থেকে দাম প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘ সময় উচ্চ সুদের হার বজায় রাখতে পারে—এমন প্রত্যাশা এবং এশিয়ার বাজারে স্বর্ণের দুর্বল চাহিদা দাম কমার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ডলারের নিচে নেমে আসায় বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন করে স্বর্ণ কেনার আগ্রহ বাড়তে পারে। তবে বাজারে দাম আবার কবে ঘুরে দাঁড়াবে, তা নির্ভর করবে সুদের হার, বিনিয়োগকারীদের আচরণ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

বিশ্ববাজারে এই দরপতনের প্রভাব বাংলাদেশের স্বর্ণের বাজারে কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে স্থানীয় বাজারের চাহিদা, ডলারের বিনিময় হার এবং বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) মূল্য নির্ধারণের ওপর। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেই দেশে একই হারে স্বর্ণের দাম কমে যায় না।

Please Share This Post in Your Social Media

বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় ধস, এক বছরে সর্বনিম্ন পর্যায়ে

Update Time : ১০:৩০:১৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
Print

এক দিনে ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে সোনার দাম, ৫০ ডলারের নিচে রূপা; প্রযুক্তি শেয়ারের পতনের প্রভাব ধাতুর বাজারেও

বিশ্ববাজারে স্বর্ণ ও অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর দামে বড় ধরনের পতন হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে বিপুল বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত মুনাফা না আসার আশঙ্কায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে দরপতন হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক পণ্যবাজারেও। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) লেনদেনের একপর্যায়ে স্বর্ণের দাম গত এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। একই সময়ে রূপার দামও ১১ মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো আউন্সপ্রতি ৫০ ডলারের নিচে নেমেছে।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৩ হাজার ৮৮০ দশমিক ৯৭ ডলারে নেমে আসে। ২০২৫ সালের অক্টোবরের পর এটিই ছিল সর্বনিম্ন দর। প্রতি আউন্সে ৩১ দশমিক ১০৩৫ গ্রাম এবং এক ভরিতে প্রায় ১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম ধরে হিসাব করলে এই দরে এক ভরি খাঁটি স্বর্ণের আন্তর্জাতিক কাঁচামূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৪৫৫ ডলার। তবে এটি বাংলাদেশের বাজারে গয়নার বিক্রয়মূল্য নয়।

অন্যদিকে, একই দিনে স্পট মার্কেটে রূপার দাম ৬ দশমিক ৫ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪৯ ডলারে নেমে আসে। প্রায় ১১ মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো মূল্যবান এই ধাতুর দাম ৫০ ডলারের নিচে চলে গেল। প্লাটিনামের দাম ৪ দশমিক ২ শতাংশ কমে ১ হাজার ৪২৫ দশমিক ০২ ডলারে এবং প্যালাডিয়ামের দাম ৩ শতাংশ কমে ৯৭৬ দশমিক ০৮ ডলারে নেমে আসে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফিউচার মার্কেটেও স্বর্ণের দামে বড় পতন দেখা গেছে। ডিসেম্বর মাসে সরবরাহের জন্য স্বর্ণের ফিউচার মূল্য ৩ দশমিক ৩ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৩ হাজার ৮৯৮ দশমিক ৯০ ডলারে স্থির হয়।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা মুনাফা করতে পারবে, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে প্রযুক্তি খাতের শেয়ার বিক্রির চাপ বেড়েছে। শেয়ারবাজারে লোকসান সামাল দিতে অনেক বিনিয়োগকারী স্বর্ণের মতো নিরাপদ সম্পদও বিক্রি করছেন। এতে মূল্যবান ধাতুর বাজারে দরপতনের চাপ আরও বেড়েছে।

স্বাধীন ধাতু ব্যবসায়ী তাই ওং বাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, ‘আকাশ যেন ভেঙে পড়ছে।’ তাঁর মতে, শেয়ারবাজারে বড় ধরনের দরপতনের প্রভাব থেকে ধাতুর বাজারও রেহাই পাচ্ছে না। এআই খাতের বাজার চাঙা থাকার পেছনে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এখন সেই আয়ের স্থায়িত্ব নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

জার্মান আর্থিক প্রতিষ্ঠান কোমার্জব্যাংকের বিশ্লেষকেরা এক নোটে জানিয়েছেন, প্রযুক্তি খাতের শেয়ারে বড় ধরনের পতনের কারণে অনেক বিনিয়োগকারী লোকসান সামাল দিতে স্বর্ণের মতো সম্পদ বিক্রি করছেন। কেউ কেউ মার্জিন কলের মুখেও পড়ছেন। তবে তাঁদের ধারণা, মূল্যবান ধাতুর বাজারে শিগগিরই কিছুটা পুনরুদ্ধার দেখা যেতে পারে।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে স্বর্ণের দাম প্রতি আউন্স ৫ হাজার ৫৯৫ ডলারের রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল। সেখান থেকে দাম প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘ সময় উচ্চ সুদের হার বজায় রাখতে পারে—এমন প্রত্যাশা এবং এশিয়ার বাজারে স্বর্ণের দুর্বল চাহিদা দাম কমার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, স্বর্ণের দাম আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ডলারের নিচে নেমে আসায় বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন করে স্বর্ণ কেনার আগ্রহ বাড়তে পারে। তবে বাজারে দাম আবার কবে ঘুরে দাঁড়াবে, তা নির্ভর করবে সুদের হার, বিনিয়োগকারীদের আচরণ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।

বিশ্ববাজারে এই দরপতনের প্রভাব বাংলাদেশের স্বর্ণের বাজারে কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে স্থানীয় বাজারের চাহিদা, ডলারের বিনিময় হার এবং বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) মূল্য নির্ধারণের ওপর। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেই দেশে একই হারে স্বর্ণের দাম কমে যায় না।