০৭:২৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নদী ভরাটে থমকে বাগলির বাণিজ্য, বিপাকে ৫০ হাজার শ্রমিক

Reporter Name
  • Update Time : ০৭:২৪:৫০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
  • / 2
Print

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সম্ভাবনাময় বাগলি স্থল শুল্ক স্টেশনে পাহাড়ি বালু ও পাথরে রঙ্গাছড়া নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় নৌপথে পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের তীব্র নাব্যতা সংকটের কারণে এই বন্দর ঘিরে গড়ে ওঠা চুনাপাথর ও কয়লা আমদানি বাণিজ্যে নেমে এসেছে চরম স্থবিরতা। এর ফলে বছরে ১০০ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব দেওয়া এই শুল্ক স্টেশনের প্রায় ৩৫০ জন আমদানিকারক লোকসানের মুখে পড়েছেন এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত অন্তত ৫০ হাজার শ্রমিকের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০০৬ সালে তাহিরপুর সীমান্তে বাগলি স্থল শুল্ক স্টেশনটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আমদানিকারকেরা ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে এলসির (ঋণপত্র) মাধ্যমে এই স্টেশন দিয়ে চুনাপাথর ও কয়লা আমদানি করে আসছেন। আমদানিকৃত এসব চুনাপাথর রঙ্গাছড়া নদী দিয়ে নৌপথে বড় বড় কার্গো ও ট্রলারে বোঝাই করে দেশের শীর্ষস্থানীয় সিমেন্ট কারখানাগুলোতে কাঁচামাল হিসেবে সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের ভবন ও সড়ক নির্মাণে কংক্রিট হিসেবেও এই পাথর ব্যবহৃত হয়। এই বন্দর থেকে সরকার প্রতিবছর শতকোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করে থাকে।

ব্যবসায়ীরা জানান, ২০০৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত রঙ্গাছড়া নদীপথ দিয়ে বছরের অন্তত ১০ মাস অনায়াসে ভারী নৌযান চলাচল করতে পারত। কিন্তু ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা বালু ও পাথরে নদীটির তলদেশ ক্রমান্বয়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এখন বর্ষাকালের মাত্র দুই মাস কোনোমতে নৌযান চলাচল করতে পারে, আর বছরের বাকি ১০ মাসই নৌপথে পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ থাকে। ফলে ব্যবসায়ীদের বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ে ভাড়া করা ডিপোতে চুনাপাথর মজুদ রাখতে হচ্ছে।

বাগলি চুনাপাথর স্থল শুল্ক স্টেশন আমদানিকারক সমিতির সভাপতি কামাল হোসেন বলেন, “মেঘালয় পাহাড়ের বিভিন্ন পাহাড়ি ছড়া থেকে নেমে আসা বালু জমে রঙ্গাছড়া নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। এর ফলে বছরের ১০ মাসই পরিবহন বন্ধ থাকে, মাত্র দুই মাস চুনাপাথর সরবরাহ করা যায়। সরকার যদি দ্রুত নদীটি খননের ব্যবস্থা করে, তবে ব্যবসায়ীরা যেমন ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবেন, তেমনি সরকারের রাজস্ব আয়ও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।”

আমদানিকারক সমিতির কোষাধ্যক্ষ আব্দুল আলিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই শুল্ক স্টেশন থেকে সরকার শতকোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করলেও এখানকার সড়ক ও নৌপথের সমস্যা সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেই। নদী খনন না থাকায় বছরের অধিকাংশ সময় চুনাপাথর পরিবহন বন্ধ থাকে। ডিপোতে মাল আটকে থাকায় ব্যবসায়ীদের মূলধন আটকে যাচ্ছে। বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় এই নদী খনন এখন সময়ের দাবি।”

এদিকে নৌপথ বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন এই খাতের সাধারণ শ্রমিকেরা। বাগলি শুল্ক স্টেশন শ্রমিক সমবায় সমিতির সভাপতি আবু তাহের জানান, পুরো বর্ষা মৌসুমে ৫০ থেকে ৬০ হাজার শ্রমিক এখানে কাজ করার সুযোগ পান। কিন্তু পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে নদী অচল হয়ে যায় এবং শ্রমিকদের কাজও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে হাজার হাজার পরিবার চরম অর্থকষ্টে পড়ে। তিনি এলাকার ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের জীবন-জীবিকার স্বার্থে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রশাসনের কাছে রঙ্গাছড়া নদীটি অবিলম্বে খননের জোর দাবি জানান।

বন্দরের বিশিষ্ট কয়লা ও চুনাপাথর আমদানিকারক খালেক মোশারফ জানান, সড়কপথ ও নৌপথ উভয়ই এখন বেহাল। ব্যবসায়ীদের নিজস্ব অর্থায়নে সড়ক মেরামত করতে হয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, শুল্ক স্টেশনের পশ্চিমে ‘বাগলী নদী’তে বছরজুড়ে পর্যাপ্ত পানি থাকলেও নদীটি আন্তর্জাতিক সীমান্তের দেড়শ গজের মধ্যে অবস্থিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইনের কারণে বিজিবি সেখান দিয়ে মালামাল পরিবহনে অনুমতি দেয় না। ফলে রঙ্গাছড়া নদীই তাদের একমাত্র ভরসা।

এ অবস্থায় বাগলি স্থল শুল্ক স্টেশনের বাণিজ্য রক্ষা এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখতে অবিলম্বে রঙ্গাছড়া নদী ড্রেজিংয়ের (খনন) জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষসহ (বিআইডব্লিউটিএ) সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জরুরি পদক্ষেপ চেয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকসমাজ।

Please Share This Post in Your Social Media

নদী ভরাটে থমকে বাগলির বাণিজ্য, বিপাকে ৫০ হাজার শ্রমিক

Update Time : ০৭:২৪:৫০ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
Print

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সম্ভাবনাময় বাগলি স্থল শুল্ক স্টেশনে পাহাড়ি বালু ও পাথরে রঙ্গাছড়া নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় নৌপথে পণ্য পরিবহন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের তীব্র নাব্যতা সংকটের কারণে এই বন্দর ঘিরে গড়ে ওঠা চুনাপাথর ও কয়লা আমদানি বাণিজ্যে নেমে এসেছে চরম স্থবিরতা। এর ফলে বছরে ১০০ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব দেওয়া এই শুল্ক স্টেশনের প্রায় ৩৫০ জন আমদানিকারক লোকসানের মুখে পড়েছেন এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত অন্তত ৫০ হাজার শ্রমিকের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০০৬ সালে তাহিরপুর সীমান্তে বাগলি স্থল শুল্ক স্টেশনটি প্রতিষ্ঠা লাভ করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আমদানিকারকেরা ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে এলসির (ঋণপত্র) মাধ্যমে এই স্টেশন দিয়ে চুনাপাথর ও কয়লা আমদানি করে আসছেন। আমদানিকৃত এসব চুনাপাথর রঙ্গাছড়া নদী দিয়ে নৌপথে বড় বড় কার্গো ও ট্রলারে বোঝাই করে দেশের শীর্ষস্থানীয় সিমেন্ট কারখানাগুলোতে কাঁচামাল হিসেবে সরবরাহ করা হয়। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজের ভবন ও সড়ক নির্মাণে কংক্রিট হিসেবেও এই পাথর ব্যবহৃত হয়। এই বন্দর থেকে সরকার প্রতিবছর শতকোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করে থাকে।

ব্যবসায়ীরা জানান, ২০০৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত রঙ্গাছড়া নদীপথ দিয়ে বছরের অন্তত ১০ মাস অনায়াসে ভারী নৌযান চলাচল করতে পারত। কিন্তু ভারতের মেঘালয় পাহাড় থেকে নেমে আসা বালু ও পাথরে নদীটির তলদেশ ক্রমান্বয়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এখন বর্ষাকালের মাত্র দুই মাস কোনোমতে নৌযান চলাচল করতে পারে, আর বছরের বাকি ১০ মাসই নৌপথে পরিবহন পুরোপুরি বন্ধ থাকে। ফলে ব্যবসায়ীদের বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ব্যয়ে ভাড়া করা ডিপোতে চুনাপাথর মজুদ রাখতে হচ্ছে।

বাগলি চুনাপাথর স্থল শুল্ক স্টেশন আমদানিকারক সমিতির সভাপতি কামাল হোসেন বলেন, “মেঘালয় পাহাড়ের বিভিন্ন পাহাড়ি ছড়া থেকে নেমে আসা বালু জমে রঙ্গাছড়া নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। এর ফলে বছরের ১০ মাসই পরিবহন বন্ধ থাকে, মাত্র দুই মাস চুনাপাথর সরবরাহ করা যায়। সরকার যদি দ্রুত নদীটি খননের ব্যবস্থা করে, তবে ব্যবসায়ীরা যেমন ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবেন, তেমনি সরকারের রাজস্ব আয়ও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।”

আমদানিকারক সমিতির কোষাধ্যক্ষ আব্দুল আলিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই শুল্ক স্টেশন থেকে সরকার শতকোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করলেও এখানকার সড়ক ও নৌপথের সমস্যা সমাধানের কোনো উদ্যোগ নেই। নদী খনন না থাকায় বছরের অধিকাংশ সময় চুনাপাথর পরিবহন বন্ধ থাকে। ডিপোতে মাল আটকে থাকায় ব্যবসায়ীদের মূলধন আটকে যাচ্ছে। বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় এই নদী খনন এখন সময়ের দাবি।”

এদিকে নৌপথ বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন এই খাতের সাধারণ শ্রমিকেরা। বাগলি শুল্ক স্টেশন শ্রমিক সমবায় সমিতির সভাপতি আবু তাহের জানান, পুরো বর্ষা মৌসুমে ৫০ থেকে ৬০ হাজার শ্রমিক এখানে কাজ করার সুযোগ পান। কিন্তু পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে নদী অচল হয়ে যায় এবং শ্রমিকদের কাজও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে হাজার হাজার পরিবার চরম অর্থকষ্টে পড়ে। তিনি এলাকার ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের জীবন-জীবিকার স্বার্থে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও প্রশাসনের কাছে রঙ্গাছড়া নদীটি অবিলম্বে খননের জোর দাবি জানান।

বন্দরের বিশিষ্ট কয়লা ও চুনাপাথর আমদানিকারক খালেক মোশারফ জানান, সড়কপথ ও নৌপথ উভয়ই এখন বেহাল। ব্যবসায়ীদের নিজস্ব অর্থায়নে সড়ক মেরামত করতে হয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, শুল্ক স্টেশনের পশ্চিমে ‘বাগলী নদী’তে বছরজুড়ে পর্যাপ্ত পানি থাকলেও নদীটি আন্তর্জাতিক সীমান্তের দেড়শ গজের মধ্যে অবস্থিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইনের কারণে বিজিবি সেখান দিয়ে মালামাল পরিবহনে অনুমতি দেয় না। ফলে রঙ্গাছড়া নদীই তাদের একমাত্র ভরসা।

এ অবস্থায় বাগলি স্থল শুল্ক স্টেশনের বাণিজ্য রক্ষা এবং বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান টিকিয়ে রাখতে অবিলম্বে রঙ্গাছড়া নদী ড্রেজিংয়ের (খনন) জন্য নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষসহ (বিআইডব্লিউটিএ) সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের জরুরি পদক্ষেপ চেয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকসমাজ।