বেসরকারি চাকরিতে বেতন ‘আলোচনা সাপেক্ষে’ কত টাকা চাইবেন যেভাবে বুঝবেন
- Update Time : ১০:২৫:২৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
- / 2
সরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে সাধারণত পদের নামের পাশাপাশি বেতন স্কেল ও গ্রেড উল্লেখ থাকে। ফলে আবেদন করার আগেই চাকরিপ্রার্থীরা সম্ভাব্য মাসিক বেতন সম্পর্কে ধারণা পান। কিন্তু বেসরকারি খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানের চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে বেতনের জায়গায় লেখা থাকে ‘আলোচনা সাপেক্ষে’। এতে চাকরিপ্রার্থীদের পক্ষে নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কত টাকা বেতন চাওয়া উচিত, তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিপণন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন খাতের চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে দায়িত্ব, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার শর্ত বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হলেও বেতনের অঙ্ক অনেক সময় প্রকাশ করা হয় না। ফলে চাকরিপ্রার্থীদের বেতন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা ছাড়াই আবেদন করতে হয়।
বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য স্নাতক হওয়া তরুণদের জন্য বিষয়টি বেশি জটিল। পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকায় তাঁরা অনেক সময় বুঝতে পারেন না, কোন পদের জন্য কত টাকা বেতন চাওয়া যুক্তিযুক্ত। আবার সাক্ষাৎকারে বেতন নিয়ে প্রশ্ন করলে নিয়োগদাতার কাছে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে কি না, সেই আশঙ্কাও কাজ করে।
বেতন সম্পর্কে ধারণা না থাকলে সমস্যা কোথায়?
চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে বেতন উল্লেখ না থাকলে প্রার্থীরা চাকরিটির আর্থিক সুবিধা ও নিজের যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারেন না। কোন পদে সাধারণত কত বেতন দেওয়া হয়, কোন দক্ষতার জন্য বেশি বেতন চাওয়া যায় কিংবা মূল বেতনের বাইরে কী কী সুযোগ-সুবিধা রয়েছে—এসব বিষয়ে তাঁদের অনিশ্চয়তা থাকে।
সদ্য স্নাতক হয়ে চাকরি খুঁজছেন, এমন অনেক প্রার্থী পছন্দের পদ দেখেও আবেদন করার আগে দ্বিধায় পড়েন। বেতন কত হতে পারে, সে সম্পর্কে ধারণা না থাকায় নিজের প্রত্যাশা ঠিক করাও কঠিন হয়ে পড়ে। বেশি বেতন চাইলে নিয়োগদাতা বাদ দিতে পারেন, আবার কম বেতন চাইলে নিজের যোগ্যতার তুলনায় কম পারিশ্রমিকে কাজ করতে হতে পারে—এমন আশঙ্কাও থাকে।
সমস্যাটি শুধু নতুন চাকরিপ্রার্থীদের ক্ষেত্রে নয়। যাঁরা আগে থেকেই চাকরি করছেন, তাঁরাও নতুন প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগে বর্তমান বেতন, যাতায়াত ব্যয়, কাজের সময় ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে তুলনা করতে চান। কিন্তু বিজ্ঞপ্তিতে বেতনের তথ্য না থাকলে আগেভাগে সেই হিসাব করা কঠিন হয়।
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবির মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান মোশাররফ হোসেনের মতে, বাংলাদেশের বেসরকারি চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে ‘আলোচনা সাপেক্ষে’ বা ‘আকর্ষণীয় বেতন’ লেখার প্রবণতা পেশাদার মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক সময় প্রার্থী নতুন প্রতিষ্ঠানে বেশি বেতনের আশায় আবেদন করলেও নিয়োগের চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে আগের চেয়ে কম বেতনের প্রস্তাব পান। এতে প্রার্থী ও নিয়োগদাতা—উভয় পক্ষের সময় ও শ্রম নষ্ট হয়।
কত টাকা বেতন চাইবেন, বুঝবেন যেভাবে
বেতন নিয়ে আলোচনার আগে নিজের প্রস্তুতি থাকা জরুরি। চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে বেতন উল্লেখ না থাকলেও কয়েকটি বিষয় বিবেচনা করে প্রত্যাশিত বেতন নির্ধারণ করা যায়।
প্রথমত, একই ধরনের পদের বাজারদর জানুন। একই খাতের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে সমমানের পদে কত বেতন দেওয়া হয়, সে সম্পর্কে ধারণা নিন। পরিচিতজন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী কিংবা সংশ্লিষ্ট খাতে কাজ করেন—এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। এতে নিজের প্রত্যাশিত বেতন বাস্তবসম্মত কি না, তা বোঝা সহজ হবে।
দ্বিতীয়ত, নিজের দক্ষতা ও যোগ্যতা মূল্যায়ন করুন। শিক্ষাগত যোগ্যতা, কাজের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, ভাষাজ্ঞান এবং পদের দায়িত্ব বিবেচনায় নিন। সদ্য স্নাতক হলে পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকলেও সংশ্লিষ্ট দক্ষতা, ইন্টার্নশিপ বা প্রকল্পে কাজের অভিজ্ঞতা বেতন আলোচনায় প্রাসঙ্গিক হতে পারে।
তৃতীয়ত, মাসিক খরচের হিসাব করুন। বাসাভাড়া, যাতায়াত, খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ব্যয় হিসাব করে ন্যূনতম কত বেতন প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করুন। তবে শুধু ব্যক্তিগত খরচের ওপর ভিত্তি করে বেতন ঠিক না করে পদের দায়িত্ব ও বাজারদরও বিবেচনায় রাখতে হবে।
চতুর্থত, সাক্ষাৎকারে বেতনসীমা জানতে চান। নিজের প্রত্যাশা জানানোর আগে প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত বেতন সম্পর্কে প্রশ্ন করা যেতে পারে। যেমন, ‘এই পদের জন্য প্রতিষ্ঠানের নির্ধারিত বেতনসীমা সম্পর্কে জানতে পারি কি?’ এভাবে জানতে চাইলে নিয়োগদাতার বাজেট সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া সম্ভব।
পঞ্চমত, শুধু মূল বেতন দেখবেন না। উৎসব ভাতা, যাতায়াত ভাতা, প্রভিডেন্ট ফান্ড, স্বাস্থ্যবিমা, বোনাস ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বিবেচনা করুন। দুটি চাকরির মূল বেতন সমান হলেও অতিরিক্ত সুবিধার কারণে সামগ্রিক আর্থিক সুবিধায় পার্থক্য হতে পারে।
ষষ্ঠত, যুক্তি দিয়ে প্রত্যাশিত বেতন জানান। বেতন চাওয়ার সময় নিজের দক্ষতা, পদের দায়িত্ব এবং বাজারদরের ভিত্তিতে প্রত্যাশার ব্যাখ্যা দিন। একটি নির্দিষ্ট অঙ্কে আটকে না থেকে যুক্তিসংগত বেতনসীমা জানানো যেতে পারে। প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব প্রত্যাশার চেয়ে কম হলে বেতন পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে কি না, সেটিও ভদ্রভাবে জানতে পারেন।
দর-কষাকষির আগে যে বিষয়গুলো মনে রাখবেন
বেতন নিয়ে আলোচনার সময় শুধু বেশি টাকা পাওয়ার দিকে মনোযোগ না দিয়ে চাকরির সামগ্রিক শর্ত বিবেচনা করা প্রয়োজন। কাজের সময়, দায়িত্বের পরিধি, কর্মস্থলে যাতায়াত, ছুটি, প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং ভবিষ্যতে পেশাগত উন্নতির সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব গ্রহণের আগে বেতনটি মাসিক মোট বেতন, নাকি মূল বেতন—তা পরিষ্কার করে নেওয়া উচিত। পাশাপাশি বেতন থেকে কোনো কর্তন হবে কি না এবং অতিরিক্ত সুবিধাগুলো কীভাবে দেওয়া হবে, সে বিষয়েও জানতে পারেন।
চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে বেতন উল্লেখ না থাকলেও প্রার্থীরা প্রস্তুতি নিয়ে আলোচনায় অংশ নিতে পারেন। নিজের যোগ্যতা ও বাজারদর সম্পর্কে ধারণা থাকলে প্রত্যাশিত বেতন জানানো সহজ হয়। একই সঙ্গে নিয়োগদাতার বাজেট সম্পর্কে আগে থেকে জানতে পারলে অপ্রয়োজনীয় অনিশ্চয়তাও কমে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে বেতনের অঙ্ক বা অন্তত একটি সম্ভাব্য বেতনসীমা উল্লেখ করা হলে আবেদনকারীরা আগেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে নিয়োগদাতা ও চাকরিপ্রার্থী—উভয় পক্ষের সময় ও শ্রম সাশ্রয় হয়। আর বিজ্ঞপ্তিতে ‘আলোচনা সাপেক্ষে’ লেখা থাকলেও বাজারদর যাচাই, নিজের দক্ষতা মূল্যায়ন এবং সুযোগ-সুবিধার হিসাব করে আলোচনায় গেলে নিজের জন্য যুক্তিসংগত বেতন নির্ধারণ করা সম্ভব।



















