০১:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শতবর্ষী মসজিদ সরাতে চায় মোদি সরকার, প্রশ্ন আদালতের

Reporter Name
  • Update Time : ১০:২২:১৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
  • / 13
Print

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির কৃষি ভবন চত্বর থেকে শতবর্ষী কাদেমি মসজিদ সরিয়ে নেওয়ার পক্ষে দিল্লি হাইকোর্টে অবস্থান জানিয়েছে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার। সরকারি দপ্তরের চত্বরে স্থায়ী ধর্মীয় স্থাপনা থাকা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে আদালতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে যুক্তি দিয়েছে সরকার। তবে মসজিদটি সরানো হলে বিকল্প জায়গা দেওয়ার নিয়ম কী, তা জানতে চেয়েছেন আদালত।

সেন্ট্রাল ভিস্তা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কৃষি ভবন ও পাশের শাস্ত্রী ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ কারণে কৃষি ভবন চত্বরে অবস্থিত কাদেমি মসজিদ সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে কেন্দ্র। সরকারের দাবি, রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বজায় রাখা তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) আদালতে কেন্দ্রের অবস্থান প্রকাশের মধ্য দিয়ে মসজিদটি সরানোর পরিকল্পনা স্পষ্ট হয়েছে। আগামী ২৩ নভেম্বর মামলাটির পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।

তবে মসজিদটির দীর্ঘ ইতিহাস সরকারের যুক্তিকে ঘিরে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নতুন রাজধানী নির্মাণের জন্য জমি জরিপ শুরু হয়। সে সময়ের সরকারি নথিতেই কাদেমি মসজিদের অস্তিত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়।

১৯১২ সালে ব্রিটিশ স্থপতি এডউইন লুটিয়েন্স যখন নতুন দিল্লির নকশা তৈরি করছিলেন, তখনকার সরকারি মানচিত্রেও মসজিদটির অবস্থান চিহ্নিত ছিল। অর্থাৎ, ১৯৫৭ সালে কৃষি ভবন নির্মাণের অনেক আগেই ওই স্থানে মসজিদটি ছিল। ১৯৭০ সালের দিল্লি সরকারি গেজেটেও কাদেমি মসজিদকে বৈধ ও তালিকাভুক্ত ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

সেন্ট্রাল ভিস্তা প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকা ছয়টি মসজিদের সুরক্ষা চেয়ে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল দিল্লি ওয়াকফ বোর্ড। সে সময় কেন্দ্রের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানিয়েছিলেন, এসব ধর্মীয় স্থাপনার কোনো ক্ষতি করা হবে না। প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদি এবং তখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলেও উল্লেখ করেছিলেন তিনি।

তবে এবার কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। মসজিদ সরানোর পক্ষে ধর্মনিরপেক্ষতার যুক্তি তুলে ধরেছে সরকার। এ অবস্থান নিয়ে শুনানিতে প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি।

কেন্দ্রের আইনজীবী নিশান্ত গৌতমের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি দয়াল জানতে চান, কোনো ধর্মীয় স্থাপনা সরিয়ে নেওয়া হলে বিকল্প জায়গা দেওয়ার বিষয়ে কী নিয়ম রয়েছে। সব ধর্মীয় স্থাপনার ক্ষেত্রেই কি বিকল্প জায়গা দেওয়া হবে না, নাকি সরকারি জায়গায় কোনো সম্প্রদায়ের প্রার্থনাস্থল থাকতে পারবে না—কেন্দ্রকে তা স্পষ্ট করতে বলেন তিনি।

বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, সরকারি সম্পত্তিতে ধর্মীয় স্থাপনা থাকা অননুমোদিত—কেন্দ্রের এই বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ ও প্রভাব পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হলে আদালতের পক্ষে এ বিষয়ে আইনি সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।

ফলে কাদেমি মসজিদ সরানোর বিষয়টি এখন কেবল উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থাপনাটির ঐতিহাসিক অস্তিত্ব, ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি, ধর্মীয় অধিকার এবং রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতার সাংবিধানিক ব্যাখ্যার প্রশ্ন। আগামী শুনানিতে এসব বিষয়ে কেন্দ্রের ব্যাখ্যা মামলার পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

Please Share This Post in Your Social Media

শতবর্ষী মসজিদ সরাতে চায় মোদি সরকার, প্রশ্ন আদালতের

Update Time : ১০:২২:১৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
Print

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির কৃষি ভবন চত্বর থেকে শতবর্ষী কাদেমি মসজিদ সরিয়ে নেওয়ার পক্ষে দিল্লি হাইকোর্টে অবস্থান জানিয়েছে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার। সরকারি দপ্তরের চত্বরে স্থায়ী ধর্মীয় স্থাপনা থাকা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে আদালতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে যুক্তি দিয়েছে সরকার। তবে মসজিদটি সরানো হলে বিকল্প জায়গা দেওয়ার নিয়ম কী, তা জানতে চেয়েছেন আদালত।

সেন্ট্রাল ভিস্তা উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কৃষি ভবন ও পাশের শাস্ত্রী ভবন ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ কারণে কৃষি ভবন চত্বরে অবস্থিত কাদেমি মসজিদ সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে কেন্দ্র। সরকারের দাবি, রাষ্ট্রীয় সম্পত্তির ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র বজায় রাখা তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) আদালতে কেন্দ্রের অবস্থান প্রকাশের মধ্য দিয়ে মসজিদটি সরানোর পরিকল্পনা স্পষ্ট হয়েছে। আগামী ২৩ নভেম্বর মামলাটির পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।

তবে মসজিদটির দীর্ঘ ইতিহাস সরকারের যুক্তিকে ঘিরে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারতের রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নতুন রাজধানী নির্মাণের জন্য জমি জরিপ শুরু হয়। সে সময়ের সরকারি নথিতেই কাদেমি মসজিদের অস্তিত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়।

১৯১২ সালে ব্রিটিশ স্থপতি এডউইন লুটিয়েন্স যখন নতুন দিল্লির নকশা তৈরি করছিলেন, তখনকার সরকারি মানচিত্রেও মসজিদটির অবস্থান চিহ্নিত ছিল। অর্থাৎ, ১৯৫৭ সালে কৃষি ভবন নির্মাণের অনেক আগেই ওই স্থানে মসজিদটি ছিল। ১৯৭০ সালের দিল্লি সরকারি গেজেটেও কাদেমি মসজিদকে বৈধ ও তালিকাভুক্ত ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

সেন্ট্রাল ভিস্তা প্রকল্পের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকা ছয়টি মসজিদের সুরক্ষা চেয়ে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল দিল্লি ওয়াকফ বোর্ড। সে সময় কেন্দ্রের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা আদালতকে জানিয়েছিলেন, এসব ধর্মীয় স্থাপনার কোনো ক্ষতি করা হবে না। প্রকল্পটি দীর্ঘমেয়াদি এবং তখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলেও উল্লেখ করেছিলেন তিনি।

তবে এবার কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। মসজিদ সরানোর পক্ষে ধর্মনিরপেক্ষতার যুক্তি তুলে ধরেছে সরকার। এ অবস্থান নিয়ে শুনানিতে প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি।

কেন্দ্রের আইনজীবী নিশান্ত গৌতমের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি দয়াল জানতে চান, কোনো ধর্মীয় স্থাপনা সরিয়ে নেওয়া হলে বিকল্প জায়গা দেওয়ার বিষয়ে কী নিয়ম রয়েছে। সব ধর্মীয় স্থাপনার ক্ষেত্রেই কি বিকল্প জায়গা দেওয়া হবে না, নাকি সরকারি জায়গায় কোনো সম্প্রদায়ের প্রার্থনাস্থল থাকতে পারবে না—কেন্দ্রকে তা স্পষ্ট করতে বলেন তিনি।

বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, সরকারি সম্পত্তিতে ধর্মীয় স্থাপনা থাকা অননুমোদিত—কেন্দ্রের এই বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ ও প্রভাব পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হলে আদালতের পক্ষে এ বিষয়ে আইনি সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।

ফলে কাদেমি মসজিদ সরানোর বিষয়টি এখন কেবল উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থাপনাটির ঐতিহাসিক অস্তিত্ব, ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে স্বীকৃতি, ধর্মীয় অধিকার এবং রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতার সাংবিধানিক ব্যাখ্যার প্রশ্ন। আগামী শুনানিতে এসব বিষয়ে কেন্দ্রের ব্যাখ্যা মামলার পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।