ন্যায়বিচারের জন্য আর কত অপেক্ষা-অ্যাডভোকেট নোমান ছিদ্দিকী
- Update Time : ০৯:০৩:২৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
- / 7

সন্দ্বীপের কাছে আমার একটি প্রশ্ন: ন্যায়বিচারের জন্য আর কত অপেক্ষা?
লেখক: অ্যাডভোকেট নোমান ছিদ্দিকী
তারিখ: ০৪ অক্টোবর ২০২৬
কিছু স্মৃতি মানুষকে কাঁদায়, কিছু স্মৃতি মানুষকে বদলে দেয়। আর কিছু স্মৃতি সারাজীবন বুকের ভেতর এমন একটি প্রশ্ন হয়ে বেঁচে থাকে, যার উত্তর মানুষ খুঁজে ফেরে বছরের পর বছর।
আমার জীবনেও তেমন কিছু স্মৃতি আছে। সেই স্মৃতির কেন্দ্রে রয়েছেন আমার বাবা, মরহুম আবুল কাশেম সওদাগর। সন্দ্বীপ টাউনের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন। তাঁর হাত ধরেই আমার রাজনৈতিক পথচলার শুরু। তখন আমার বয়স আনুমানিক নয় বছর। আজ আমি একজন আইনজীবী। পেশাগত পরিচয়ের পাশাপাশি মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখি। কিন্তু এই স্বপ্নের পেছনে যে দীর্ঘ ব্যক্তিগত ইতিহাস রয়েছে, তা অনেকেরই অজানা।
আজ সেই ইতিহাসের কিছু কথা বলতে চাই।
বাবার হাত ধরে রাজনীতির প্রথম পাঠ
২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন বর্তমান সংসদ সদস্য মোস্তাফা কামাল পাশা। তাঁর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থী, সাবেক তিনবারের সংসদ সদস্য মাহফুজুর রহমান মিতা। আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন ডা. জামাল।
সেই নির্বাচনের সময় বাবার হাত ধরে প্রথম বিএনপির মিছিলে যাই। বাবা হৃদ্রোগে আক্রান্ত ছিলেন। তাই মিছিলের পেছনে রিকশায় করে একটি নির্বাচনী সভায় গিয়েছিলাম তাঁর সঙ্গে।
শুনেছি, মোস্তাফা কামাল পাশা মনোনয়ন পাওয়ার পর বাবা কয়েক ডেক মিষ্টি বিনামূল্যে মানুষের মধ্যে বিতরণ করেছিলেন। রাজনীতি সম্পর্কে তখন আমার নিজের কোনো গভীর ধারণা ছিল না। কিন্তু বাবার রাজনৈতিক বিশ্বাস, মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং দলের প্রতি তাঁর আবেগ ছোটবেলা থেকেই আমার মনে ছাপ ফেলেছিল।
বাবা প্রায়ই বলতেন, বড় হয়ে মানুষের মতো মানুষ হতে হবে, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে হলে রাজনীতি ও সমাজের সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে। তিনি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দলকে সমর্থন করার কথা বলতেন। তাঁর সেই কথাগুলো শিশুমনে গভীরভাবে গেঁথে গিয়েছিল।
আমার গায়ে ধানের শীষের একটি পিন লাগানো থাকত। আমি গর্ব করে ঘুরে বেড়াতাম। ছাত্রনেতা মসি ভাইসহ কয়েকজন বড় ভাই আমাকে খুব আদর করতেন। তাঁদের কাছে আমার ছোটবেলার রাজনীতি ছিল স্লোগান, মিছিল, মানুষের ভিড় আর নেতাদের দেখার উত্তেজনা।
কিন্তু বাবার কাছ থেকে আমি রাজনীতির আরেকটি শিক্ষা পেয়েছিলাম, যা তখন বুঝিনি—মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
সামনের কাতারে নামাজ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা
বাবার একটি বিশেষ অভ্যাস ছিল। প্রতি শুক্রবার তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে মসজিদে যেতেন। আমার বয়স কম হওয়ায় সামনের কাতারে নামাজ পড়া নিয়ে এলাকার কিছু মুরুব্বির আপত্তি থাকত। কিন্তু বাবা আমার হাত শক্ত করে ধরে সামনের কাতারেই দাঁড়াতেন।
নামাজ শেষে তিনি দানের টাকা আমার হাতে দিতেন। তখন বুঝতাম না, কেন তিনি আমাকে দিয়ে সেই টাকা বিতরণ করাতেন। আজ বুঝি, হয়তো তিনি ছোটবেলা থেকেই আমাকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অভ্যাস শেখাতে চেয়েছিলেন।
নামাজ শেষে আমরা ভাই ভাই হোটেলে বসতাম। সেখানে অনেক ফকির-মিসকিন আসতেন। বাবা তাঁদের শুধু টাকা দিয়ে বিদায় করতেন না; বরং বিনামূল্যে খাবার খাওয়াতেন। তিনি এসব নিয়ে খুব বেশি কথা বলতেন না। তাঁর কাজই ছিল তাঁর পরিচয়।
আজ পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলোর একটি ছিল বাবার সেই নীরব মানবিকতা। মানুষের জন্য কাজ করতে হলে সব সময় প্রচারের প্রয়োজন হয় না—কখনো কখনো নীরবে দায়িত্ব পালন করাই যথেষ্ট।
২০০৮ সালের নির্বাচন ও একটি শিশুর রাজনৈতিক স্মৃতি
নির্বাচন ঘনিয়ে এলে আমাদের বাড়িতে একটি রঙিন টেলিভিশন আসে। আমার কাছে সেটিও ছিল আনন্দের বিষয়। নির্বাচনী প্রচারণা, সভা-সমাবেশ আর রাজনৈতিক আলোচনা নিয়ে চারদিকে উৎসবের আমেজ ছিল।
সন্দ্বীপে মোস্তাফা কামাল পাশা জয়ী হলেও জাতীয় পর্যায়ে বিএনপি প্রত্যাশিত ফল করতে পারেনি। স্কুলে ফিরে বন্ধুদের কাছ থেকে নানা কথা শুনতে হতো। তারা আমাকে খেপাত। তখন এসবের জবাব দেওয়ার মতো রাজনৈতিক জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা আমার ছিল না।
এরপর বাবার অসুস্থতা বাড়তে থাকে। ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহের সময়ও তাঁকে টেলিভিশনের খবর নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন থাকতে দেখেছি। দোকানে টেলিভিশন চলত, আর তিনি দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতেন।
একবার ব্যবসার কাজে ও চিকিৎসার জন্য বাবা আমাকে নিয়ে চট্টগ্রামে গেলেন। বার আউলিয়া জাহাজের একটি এসি কেবিনে আমাদের যাত্রা। চট্টগ্রামে যাওয়া আমার কাছে ছিল আনন্দের ব্যাপার। কিন্তু সেই যাত্রা যে একদিন আমার জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি হয়ে থাকবে, তা তখন জানতাম না।
কেবিনে আমাদের সঙ্গে ছিলেন বর্তমান উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব আলমগীর ঠাকুর। বাবা তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, তিনি উপজেলা নির্বাচনে বই প্রতীক নিয়ে অল্পের জন্য হেরে গিয়েছিলেন।
শৈশবে সেই নির্বাচনের প্রতীকগুলো নিয়ে আমার নিজেরও মজার স্মৃতি আছে। বই, হাঁসসহ বিভিন্ন প্রতীক মিলিয়ে ছড়া কাটতাম। নির্বাচনের হিসাব বুঝতাম না, কিন্তু প্রতীকের প্রতি আগ্রহ ছিল প্রবল।
জাহাজে আলমগীর ঠাকুর ও বাবা অনেকক্ষণ গল্প করেছিলেন। একপর্যায়ে তিনি আমাকে শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শ নিয়ে একটি বই দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। সেই বই আর আমার পাওয়া হয়নি। এত বছর পরও ঘটনাটি মনে আছে।
চট্টগ্রামে পৌঁছে আমরা সন্দ্বীপ বোর্ডিংয়ে উঠেছিলাম। বাবা মুন স্টার হোটেলে খেতে যেতেন। সেখানে অনেক বিএনপি কর্মী ও পরিচিত মানুষকে দেখতাম। বাবা অনেক সময় তাঁদের খাবারের বিল পরিশোধ করে দিতেন।
ছাত্রনেতা মসি ভাই আমাকে দেখতে সন্দ্বীপ বোর্ডিংয়ে এসেছিলেন। আমি বাবার কাছে ফয়েজলেক যাওয়ার বায়না ধরলাম। তিনি ব্যস্ত থাকায় সময় দিতে পারলেন না। পরে আমাদের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের রুবেল ভাই আমাকে নিয়ে ফয়েজলেকে ঘুরতে গেলেন।
বাবার নির্দেশ ছিল, ঘুরতে গেলে প্রয়োজনীয় খরচ আমি যেন নিজেই দিই। বিকেলের আগেই লালদীঘির ময়দানে পৌঁছাতে হবে, কারণ সেখানে বিএনপির সমাবেশে খালেদা জিয়ার আসার কথা।
সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ছিলেন আমার সবচেয়ে পরিচিত রাজনৈতিক মুখগুলোর একজন। তাঁর কিছু বক্তব্য তখন শিশুমনে দাগ কেটেছিল। রাজনৈতিক বক্তব্যের অর্থ বা মামলা-মোকদ্দমার জটিলতা বুঝতাম না, কিন্তু নেতাদের কথা মন দিয়ে শুনতাম।
ফয়েজলেক থেকে ফিরে রুবেল ভাই আমাকে দ্রুত সমাবেশস্থলে নিয়ে গেলেন। বাবা বাইরে ছিলেন। হৃদ্রোগের কারণে ধাক্কাধাক্কি করে ভেতরে প্রবেশ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিনি আমাকে দ্রুত ভেতরে যেতে বললেন।
ভেতরে গিয়ে বর্তমান যুবদলের আহ্বায়ক নিঝুম ভাইকে চিনতে পারলাম। মসি ভাইকে খুঁজছিলাম। এরই মধ্যে খালেদা জিয়া সমাবেশস্থলে এলেন।
শিশু বয়সে এত বড় রাজনৈতিক নেত্রীকে সামনে থেকে দেখা ছিল এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। মানুষের স্লোগান, ভিড় আর উচ্ছ্বাসের মধ্যে কখন যে রুবেল ভাইয়ের কাঁধে উঠে পড়েছিলাম, নিজেও বুঝিনি। একজন আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলেন। সেই মুহূর্তের অনুভূতি আজও মনে পড়ে।
কিন্তু তখনও জানতাম না, রাজনীতির প্রতি এই শিশুসুলভ আকর্ষণ একদিন আমার জীবনের এত বড় অংশ হয়ে উঠবে।
বাবার শেষ দিনগুলোর স্মৃতি
চট্টগ্রামে বাবার চিকিৎসা চলছিল। তিনি ডাক্তার জলিলকে দেখাতেন। চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর ব্যক্তিগত আলাপের মধ্যে কী হতো, তার সবকিছু আমি বুঝতাম না।
ফেরার সময় একবার বাবার কাছে পর্যাপ্ত টাকা ছিল না। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার কাছে টাকা আছে কি না। তিনি জানতেন, আমি কখনো কখনো দোকানের ক্যাশ থেকে লুকিয়ে টাকা নিতাম। তিনি আমাকে কখনো কঠোরভাবে কিছু বলতেন না।
সেদিন জীবনে প্রথমবার বাবাকে টাকা ধার দেওয়ার সুযোগ পেলাম। ছোট্ট একটি ঘটনা, কিন্তু আজ মনে হলে বুকের ভেতর কেমন যেন করে।
ফেরার জাহাজে একটি আসন নিয়ে অন্য একজনের সঙ্গে বাবার বিরোধ হয়েছিল। টিকিটের আসন নিয়ে ওই ব্যক্তি তাঁর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেছিলেন। বাবার মেজাজ সম্পর্কে আমি জানতাম। ভেবেছিলাম, তিনি হয়তো প্রতিবাদ করবেন। কিন্তু তিনি কিছুই করলেন না।
হয়তো অসুস্থতা তাঁকে দুর্বল করে দিয়েছিল। হয়তো তিনি সংঘাত এড়িয়ে চলতে চেয়েছিলেন। আজ আর জানা সম্ভব নয়। তবে ঘটনাটি আমাকে শিখিয়েছে, মানুষের শক্তি সব সময় উচ্চস্বরে প্রতিবাদ করার মধ্যে থাকে না।
এরপর বাবা প্রায়ই আমাকে বলতে শুরু করলেন, তিনি আর বেশিদিন বাঁচবেন না। সম্পত্তি, ভাইবোনদের ভবিষ্যৎ এবং আমাদের দায়িত্ব নিয়ে কথা বলতেন। একই কথা কখনো কখনো সাত-আটবার বলতেন। আমি তখন ছোট; তাঁর কথার গভীরতা বুঝতাম না।
তিনি বলতেন, তাঁর সম্পদের বিষয়ে তিনি কিছু সিদ্ধান্ত ও বিশ্বাসের কথা ভেবে রেখেছেন। উত্তরাধিকার আইনের প্রকৃত হিসাব যে আইন ও পারিবারিক পরিস্থিতি অনুযায়ী নির্ধারিত হয়, তা আমি পরে আইন পড়ার সময় বুঝেছি।
বাবা রাতে ভাই ভাই হোটেলের দ্বিতীয় অংশের শোরুমে বসতেন। শরীর খারাপ হলে কখনো কখনো আমাকে দোকানে বসিয়ে রাখতেন। শিক্ষকরা ডাকতে এলে তিনি বলতেন, পড়াশোনা না হলেও সমস্যা নেই। আজ বুঝি, তাঁর অসুস্থতা ও মানসিক দুশ্চিন্তা তাঁকে কতটা আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।
একদিন বাবার বুকে ব্যথা উঠল। আমি দৌড়ে বর্তমান সেবা ফার্মেসিতে গেলাম। প্রায় জোর করেই ডা. সাহেদুর রহমানকে বাসায় নিয়ে এসেছিলাম। ডাক্তার এসে বাবাকে পরীক্ষা করে হাসপাতালে যেতে ও অক্সিজেন নিতে বলেছিলেন। বাবা অক্সিজেন নিতে রাজি হননি।
বাবার শেষ দিনগুলোর এই ঘটনাগুলো আমি খুব কম মানুষকেই বলেছি। আজ লিখতে গিয়ে বারবার থেমে যেতে হচ্ছে। আমার স্ত্রী সারা ঘুমিয়ে আছে। রাত গভীর। অথচ স্মৃতিগুলো যেন আজ নতুন করে জেগে উঠেছে।
২০১০ সালের ২৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বাবা হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন। বললেন, তিনি চলে যাচ্ছেন; তাঁর ভাইকে ডাকতে। ভাইকে ডেকে সন্তানদের দেখাশোনা করার কথাও বলেছিলেন।
আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। যে বাবা মৃত্যুর আশঙ্কার কথা আমাকে এতবার বলেছিলেন, শেষ মুহূর্তে তিনি আমার দিকে তাকালেন না। তাঁকে প্রথমে এনাম নাহার হাসপাতালে নেওয়া হলো। এর আগে রাহেল ভাই তাঁকে নেবুলাইজার দিয়েছিলেন। পরে সিদ্ধান্ত হলো, তাঁকে চট্টগ্রামে নিতে হবে।
কিন্তু সেই যাত্রা আর সম্পূর্ণ হলো না। ঘাটের পথে শ্রমিক লীগ নেতা বাদশার কোলে বাবা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন—পরিবারের কাছ থেকে এমনটাই শুনেছি।
আমার বাবা তখন মাত্র ৫৪ বছর বয়সী।
বাবা প্রায়ই বলতেন, ‘নোমান ছিদ্দিকী’ নামের অর্থ নাকি বিশ্বাসী। আজ নিজের নামের দিকে তাকালে মনে হয়, বিশ্বাস শব্দটির সঙ্গে আমার জীবনের এক গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। বাবার বিশ্বাস, মানুষের প্রতি বিশ্বাস, ন্যায়বিচারের প্রতি বিশ্বাস—সবকিছু যেন একসঙ্গে মিশে গেছে।
বাবার মৃত্যুর পর যে বাস্তবতার মুখোমুখি হলাম
বাবার মরদেহ বাড়ির বারান্দায় রাখা হলো। মানুষ আসতে শুরু করলেন। অনেকেই কাঁদলেন। আমি কেঁদেছিলাম, তবে হয়তো আমার শোকের গভীরতা তখন প্রকাশ করার মতো বয়স হয়নি।
পরদিন উপজেলা কমপ্লেক্স মাঠে বড় জানাজা অনুষ্ঠিত হলো। আমার শৈশবের রাজনৈতিক স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অনেক মানুষ ও ঘটনা মনে পড়ছিল। সেই সময়ের কিছু প্রত্যাশা পূরণ হয়নি; তার মধ্যে একটি ছিল, যাঁর নির্বাচনী প্রচারণার স্মৃতি আমার শৈশবের অংশ, সেই মোস্তাফা কামাল পাশাকে জানাজায় দেখতে না পাওয়া।
বাবার মৃত্যুর পরপরই আমাদের পরিবারের সামনে কঠিন বাস্তবতা এসে দাঁড়াল। পারিবারিক বৈঠকে শুনতে পেলাম, বাবার নামে বিপুল ঋণ রয়েছে। কীভাবে সংসার চলবে, কীভাবে ব্যবসা টিকবে, কীভাবে সম্পদের হিসাব মেলানো হবে—এসব প্রশ্ন সামনে চলে এলো।
একটি লুঙ্গি কেনার প্রয়োজনেও বড়দের কাছে যেতে হয়েছে। ছোটবেলায় যাঁকে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হিসেবে দেখেছি, তাঁর মৃত্যুর পর পরিবারের আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হওয়া ছিল আমার জন্য এক বড় ধাক্কা।
পরে জানতে পারি, বাবার নামে জমি, দোকান ও অন্যান্য সম্পদ ছিল। পারিবারিক সম্পত্তি, ঋণ, দোকান বিক্রি এবং মালিকানা নিয়ে নানা আলোচনা ও বিরোধের মধ্যে আমাদের যেতে হয়েছে। উপজেলা কমপ্লেক্স এলাকায় আমাদের পারিবারিক জমির পরিমাণ ও বর্তমান মূল্য নিয়েও বিভিন্ন কথা শুনেছি।
তবে জমির প্রকৃত পরিমাণ, মালিকানা, ঋণ এবং উত্তরাধিকারের হিসাব দলিলপত্র ও আইন অনুযায়ী নির্ধারিত হওয়া প্রয়োজন। আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি বা শোনা কথাকে আমি চূড়ান্ত আইনি সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরতে চাই না।
আমাদের পরিবারকে নানা পারিবারিক বৈঠক ও সালিশের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। সেই সময় উপলব্ধি করেছি, সম্পদ থাকলেই মানুষের অধিকার নিশ্চিত হয় না; অধিকার রক্ষা করতে প্রয়োজন সঠিক কাগজপত্র, ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত এবং কার্যকর বিচারব্যবস্থা।
আমাদের ভাই ভাই হোটেলও পরবর্তী সময়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। ২০১২ সালে হোটেলে হামলা, ভাঙচুর ও অর্থ লুটের ঘটনা ঘটে বলে আমাদের পরিবারের অভিযোগ। আমার বড় ভাইকে মারধর করা হয়েছিল বলে আমার মনে আছে। আমি সেখানে গেলে আমাকেও ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখানো হয়।
সেই সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার আজকের মতো ছিল না। ঘটনাগুলোর অনেক কিছুরই নির্ভরযোগ্য নথি বা প্রমাণ এখন সংগ্রহ করা কঠিন। এসব বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি ও অভিযোগ থাকলেও, সেগুলো যাচাইযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন হওয়া প্রয়োজন।
সেই সময় স্থানীয়ভাবে কিছু গণ্যমান্য ব্যক্তি সালিশের মাধ্যমে বিরোধ মীমাংসার চেষ্টা করতেন। কিন্তু আমার মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল—কোনো পরিবারের সঙ্গে অন্যায় হলে তার প্রতিকার পাওয়ার কার্যকর পথ কোথায়? দুর্বল মানুষ কি সব সময় ন্যায়বিচার পাবে? আর্থিক ও সামাজিক প্রভাব কি কখনো ন্যায়সংগত সিদ্ধান্তের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমি তখন পাইনি।
রাজনীতির প্রতি আকর্ষণ থেকে দায়িত্ববোধ
২০১৪ সালের দিকে রাজনৈতিক পরিবর্তন নিয়ে আমার মধ্যে নানা প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। আমি মনে করতাম, একদিন পরিস্থিতি বদলাবে এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে।
আমি ছাত্রনেতা মসি ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতাম। তাঁকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক চাপ ও হামলার মুখোমুখি হতে দেখেছি বলে মনে আছে। এসব অভিজ্ঞতা আমার রাজনৈতিক চিন্তাকে প্রভাবিত করেছে।
সময় গড়িয়েছে। শৈশবের সেই ধানের শীষের পিন হাতে ঘুরে বেড়ানো ছেলেটি একসময় নিজেই রাজনৈতিক দায়িত্ব গ্রহণের পথে এগিয়েছে।
২০২২ সালে ছাত্রদলের দায়িত্ব গ্রহণের পর রাজনীতিকে আরও কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়। রাজনীতির ভেতরে মানুষের জন্য কাজ করার সম্ভাবনা যেমন দেখেছি, তেমনি দেখেছি মতবিরোধ, সামাজিক চাপ এবং নানা ধরনের প্রতিকূলতাও।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসে। সেই পরিবর্তনের পরও আমি নিজেকে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে পড়তে দেখেছি। আমার দাবি, আমাকে সামাজিকভাবে হেয় করা হয়েছে এবং বিভিন্নভাবে অপদস্থ হতে হয়েছে। ২০২৪ সালে পরিস্থিতির চাপে সন্দ্বীপ ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল আমাকে। সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর বিষয়ে প্রশাসনিক নথি রয়েছে বলে আমি মনে করি; প্রয়োজনে সেগুলো যাচাই করা যেতে পারে।
আমার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে আমি একটি বিষয় উপলব্ধি করেছি—রাজনীতি শুধু দলীয় পরিচয় বা ক্ষমতার প্রশ্ন নয়। রাজনীতি মানুষের মর্যাদা, অধিকার এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
কেউ যদি নিজের অভিজ্ঞতার কারণে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চান, তাঁকে ব্যক্তিগত আক্রমণ বা অপমানের পরিবর্তে যুক্তি ও আইনের মাধ্যমে মোকাবিলা করা উচিত। মতবিরোধ থাকতেই পারে; কিন্তু মানুষের সম্মান ও অধিকার যেন ক্ষুণ্ন না হয়।
আমি আমার বাবার মৃত্যুর সঙ্গে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঘটনা বা ব্যক্তির দায়কে প্রমাণ ছাড়া যুক্ত করতে চাই না। তবে বাবার মৃত্যুর পর পারিবারিক সংকট, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ এবং পরবর্তী সময়ে নিজের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যে অসহায়ত্ব ও ক্ষোভ অনুভব করেছি, তা আমার ন্যায়বিচারের আকাঙ্ক্ষাকে গভীর করেছে।
আমার কাছে এটাই ব্যক্তিগত ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
একজন আইনজীবী হিসেবে আমার অঙ্গীকার
আজ আমি একজন আইনজীবী। জেলা বার সমিতির সদস্য হিসেবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সন্দ্বীপের মানুষের জন্য কাজ করতে চাই।
আমার বিশ্বাস, বিচার পাওয়ার অধিকার শুধু প্রভাবশালী মানুষের জন্য নয়। একজন দরিদ্র মানুষ, একজন এতিম, একজন অসহায় নারী, একজন ব্যবসায়ী কিংবা সম্পত্তি নিয়ে বিরোধে জড়িয়ে পড়া সাধারণ নাগরিক—সবারই ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
সন্দ্বীপে সালিশের একটি সামাজিক ভূমিকা রয়েছে। স্থানীয় বিরোধ শান্তিপূর্ণভাবে মীমাংসা করার ক্ষেত্রে সালিশ সহায়ক হতে পারে। কিন্তু সালিশের নামে কারও ন্যায্য অধিকার নষ্ট করা, কাউকে ভয় দেখানো বা আইনসম্মত প্রতিকার পাওয়ার পথ বন্ধ করা কখনো গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
বিশেষ করে এতিম ও অসহায় মানুষের সম্পত্তি এবং উত্তরাধিকারের অধিকার রক্ষায় আমাদের আরও সচেতন হতে হবে। কারও সামাজিক অবস্থান, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা আর্থিক সামর্থ্য যেন ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারক হয়ে না দাঁড়ায়।
আমি এমন একটি সন্দ্বীপ দেখতে চাই, যেখানে মানুষ নিজের অধিকার নিয়ে কথা বলতে ভয় পাবে না। যেখানে বিরোধের সমাধান হবে আইন, ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া ও প্রমাণের ভিত্তিতে। যেখানে নাগরিক সেবা পেতে পরিচয় বা প্রভাবের প্রয়োজন হবে না।
এই লক্ষ্য থেকেই আমি সন্দ্বীপ পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা ভাবছি।
আমি জানি, নির্বাচনে অংশ নেওয়া মানেই সব সমস্যার সমাধান করার ক্ষমতা অর্জন নয়। একজন কাউন্সিলরের দায়িত্ব ও ক্ষমতারও নির্দিষ্ট সীমা রয়েছে। তবু স্থানীয় সরকারব্যবস্থার মধ্যে থেকেই নাগরিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা, পৌরসভার সেবার মান বাড়ানোর চেষ্টা করা, জনসাধারণের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগ রয়েছে।
আমি একটি আধুনিক মডেল পৌরসভা গঠনের স্বপ্ন দেখি—যেখানে পরিচ্ছন্নতা, ড্রেনেজ, সড়ক, নাগরিক সেবা, স্বচ্ছতা এবং মানুষের অংশগ্রহণ গুরুত্ব পাবে। আমি চাই, জনপ্রতিনিধি ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব কমুক। জনগণের অর্থ, জনগণের সম্পদ এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষায় জবাবদিহির সংস্কৃতি গড়ে উঠুক।
আমি চাই না, কোনো মানুষকে নিজের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হোক। কোনো পরিবারকে অসহায়ত্বের মধ্যে পড়ে থাকতে হোক। কোনো তরুণকে সামাজিক অপমানের ভার বয়ে বেড়াতে হোক।
শেষ কথা: আমার বাবার স্মৃতি, আমার দায়বদ্ধতা
আজ এত বছর পরও বাবার কথা মনে পড়লে চোখ ভিজে আসে। তাঁর সঙ্গে কাটানো ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই এখন আমার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
মনে পড়ে, কীভাবে তিনি আমার হাত ধরে সামনের কাতারে দাঁড়াতেন। কীভাবে আমার হাতে দানের টাকা দিতেন। কীভাবে অসুস্থ শরীর নিয়েও মানুষের সঙ্গে সময় কাটাতেন। আর মনে পড়ে, মৃত্যুর আগে কীভাবে তিনি আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতেন।
বাবার রেখে যাওয়া সব প্রশ্নের উত্তর আমি পাইনি। জীবনের সব ক্ষোভেরও সমাধান হয়নি। কিন্তু আজ আমি বুঝি, অতীতের প্রতিটি কষ্টকে শুধু ব্যক্তিগত আক্রোশে পরিণত করলে কোনো সমাজ বদলায় না। সেই অভিজ্ঞতাকে দায়িত্ববোধে রূপান্তর করতে পারলেই পরিবর্তনের পথ তৈরি হয়।
আমি প্রতিশোধ চাই না; আমি ন্যায়বিচার চাই। আমি আধিপত্যের সংস্কৃতি চাই না; আমি আইনের শাসন চাই। আমি বিভাজনের রাজনীতি চাই না; আমি মানুষের অধিকার ও মর্যাদাকে প্রাধান্য দিতে চাই।
সন্দ্বীপ আমার জন্মভূমি। এই জনপদের মানুষের কাছে আমার প্রত্যাশা আছে, আবার দায়বদ্ধতাও আছে। আমার রাজনৈতিক পরিচয় থাকতে পারে, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থাকতে পারে, কিন্তু জনসেবার প্রশ্নে আমার কাছে মানুষের অধিকারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।
আমি জানি না, আমার এই পথ কতটা কঠিন হবে। তবে এটুকু জানি, ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানোর দায়িত্ব থেকে আমি সরে আসতে চাই না।
আমার মতো আর কাউকে যেন বছরের পর বছর বুকের ভেতর তীব্র ক্ষোভ নিয়ে অপেক্ষা করতে না হয়। কোনো পরিবার যেন অসহায়ত্বের কারণে নিজের অধিকার হারিয়ে না ফেলে। কোনো নাগরিক যেন সামাজিক আধিপত্যের কাছে নিজের মর্যাদা বিসর্জন দিতে বাধ্য না হয়।
আমার স্বপ্ন—একটি ন্যায়ভিত্তিক সন্দ্বীপ, একটি আধুনিক মডেল পৌরসভা এবং এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষের পরিচয় নয়, তার অধিকার ও মর্যাদাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এই স্বপ্ন নিয়েই আমি এগিয়ে যেতে চাই।
অ্যাডভোকেট নোমান ছিদ্দিকী
সভাপতি, ৮ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদল, সন্দ্বীপ পৌরসভা
ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক, ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি, সন্দ্বীপ পৌরসভা
২১ অক্টোবর ২০২৬
























