নেতানিয়াহুকে সরাতে জোটের পথে ইসরায়েলের চার বিরোধী দল
- Update Time : ১০:২৮:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
- / 4

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে জোট গঠনের আলোচনা শুরু করতে একমত হয়েছেন দেশটির চারটি ইহুদি বিরোধী দলের নেতা। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) হার্জলিয়ায় বৈঠক শেষে তাঁরা দ্রুত জোট আলোচনা শুরু এবং নতুন নেসেটের অধিবেশনের আগে সংসদীয় কৌশল সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নেন। তবে আরব দলগুলোর সমর্থন ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের কোনো সুস্পষ্ট পথ এখনো বের করতে পারেননি তাঁরা।
গত সপ্তাহের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। বর্তমানে তাঁর জোটের আসনসংখ্যা ৫৩। অন্যদিকে চারটি ইহুদি বিরোধী দলের আসন রয়েছে ৪৮টি। ১২০ সদস্যের নেসেটে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি আসন। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে বিরোধীদের দুটি আরব দলের সমর্থন প্রয়োজন। দল দুটি সম্মিলিতভাবে পেয়েছে ১৯টি আসন। কিন্তু বিরোধী শিবিরের অধিকাংশ নেতা আরব দলগুলোকে সরকারে অংশীদার করতে আগ্রহী নন।
বৈঠক শেষে প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে ইয়াশার নেতা গাদি আইজেনকট, বি’ইয়াচাদ দলের চেয়ারম্যান নাফতালি বেনেট, ডেমোক্র্যাটস পার্টির প্রধান ইয়ার গোলান এবং ইসরায়েল বেইতেনুর নেতা আভিগদর লিবারম্যান দ্রুত নেতানিয়াহু সরকারকে সরানোর অঙ্গীকার করেন। গাদি আইজেনকটের প্রস্তাবিত চারটি নীতির ভিত্তিতে নতুন সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তাঁরা।
প্রস্তাবিত নীতিগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলকে ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকার, সবার জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা এবং হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে গাজায় তাদের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস ও শাসনের অবসান ঘটানো।
বিবৃতিতে বলা হয়, দলগুলোর নেতারা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন। ৭ অক্টোবরের ঘটনার পর গঠিত বর্তমান সরকারকে সরিয়ে জাতীয় জরুরি সরকার প্রতিষ্ঠায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। নেসেটে বিরোধীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থান কাজে লাগানোর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বৈঠকে বি’ইয়াচাদের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিদায়ী নেসেটের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদও উপস্থিত ছিলেন। নতুন নেসেটের অধিবেশন শুরু হলে বিরোধীদের প্রথম দিকের পদক্ষেপ হতে পারে লিকুদ দলের আইনপ্রণেতা আমির ওহানাকে স্পিকারের পদ থেকে সরানো। এতে নেতানিয়াহুর বাধার মুখে থাকা কয়েকটি আইন প্রস্তাব এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর মধ্যে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার তদন্তে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের বিষয়টি রয়েছে।
একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকে আমির ওহানাকে সরিয়ে ইয়ার লাপিদকে স্পিকার করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আগামী সোমবার নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বিরোধী নেতারা।
বৈঠকে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের কাছে সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ গাদি আইজেনকটকে দেওয়ার সুপারিশের বিষয়েও একমত হন তাঁরা। পাশাপাশি জোট গঠনের আলোচনা ও নীতিগত নির্দেশিকা তৈরির কাজ অবিলম্বে শুরু করতে নিজেদের আলোচক দলকে নির্দেশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এদিকে নির্বাচনের ফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে নেতানিয়াহু ও তাঁর দল লিকুদের প্রচারণার সমালোচনা করেছেন বিরোধী নেতারা। তাঁদের ভাষায়, এটি একটি ‘বিপজ্জনক ও উন্মত্ত প্রচারণা’। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রক্ষায় তাঁরা কাজ করার অঙ্গীকার করেছেন।
লিকুদ পার্টির অভিযোগ, কাতার বা অন্য কোনো বিদেশি শক্তি গোপনে অর্থ দিয়ে আরব ভোটারদের ভোটদানে উৎসাহিত করেছে এবং নির্বাচনের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি। নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদনের প্রক্রিয়া পিছিয়ে দেওয়ার দাবিও তুলেছিল দলটি। কিন্তু নির্বাচন তদারকির দায়িত্বে থাকা সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নোআম সোলবার্গ সেই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন।
বৈঠকের পর বি’ইয়াচাদ নেতা নাফতালি বেনেট আইজেনকটের সরকার গঠনের উদ্যোগে তাঁর দলের পূর্ণ সমর্থনের কথা জানান। তিনি বলেন, আইজেনকটকে দ্রুত সরকার গঠনে সহায়তা করতে দলের সবাই সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। সময় নষ্ট না করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার ওপরও জোর দেন তিনি।
বেনেট আরও বলেন, নেসেটের স্পিকারের পদ থেকে আমির ওহানাকে সরিয়ে একটি ‘জাতীয় পুনর্গঠনমূলক জায়নবাদী সরকার’ গঠনের পথ তৈরি করতে হবে। তাঁর মতে, নতুন সরকারের মাধ্যমে সামরিক সেবায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
বৈঠকে যোগ দেওয়ার আগে ইয়ার লাপিদও নির্বাচনের ফল দুর্বল করার চেষ্টার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সরকার গঠন করা জরুরি। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আবারও প্রমাণ করেছে, নেতানিয়াহুকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরানো প্রয়োজন।
অন্যদিকে, বিরোধী নেতাদের বৈঠকের আগে ডেমোক্র্যাটস পার্টির প্রধান ইয়ার গোলান আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিন ও আহমেদ তিবির সঙ্গে বৈঠক করেন। নির্বাচনের পর এটিই ছিল তাঁদের প্রথম বৈঠক।
গোলানের দলের বিবৃতিতে বলা হয়, বৈঠকে সংসদীয় সমন্বয়, সংখ্যাগরিষ্ঠতা কাজে লাগিয়ে নেতানিয়াহু সরকারকে সরানোর উদ্যোগ এবং আরব জনগোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব সমস্যার বাস্তবসম্মত সমাধান এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও কথা বলেন তাঁরা। পরিবর্তনের সরকার গঠনের লক্ষ্যে পরবর্তী রাজনৈতিক পদক্ষেপের আগে যোগাযোগ ও সমন্বয় অব্যাহত রাখার বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়েছে।
সরকার গঠনে আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন গোলান। ভবিষ্যৎ জোট সরকারে তাদের অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনাও নাকচ করেননি তিনি। চার দলের ইহুদি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটে তিনিই একমাত্র নেতা, যিনি প্রকাশ্যে এমন সহযোগিতার পক্ষে কথা বলেছেন।
অন্যদিকে, বিরোধী জোটের বাকি নেতারা আরব দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। লিবারম্যান আরব দলগুলোর সমর্থননির্ভর সংখ্যালঘু সরকার গঠনেরও বিরোধিতা করেছেন। মঙ্গলবার তিনি বলেন, আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থন ছাড়াই স্থিতিশীল সরকার গঠন সম্ভব।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে লিবারম্যান বলেন, আরেকটি নির্বাচন ঠেকানো প্রয়োজন। বর্তমান পরিস্থিতিতে সঠিকভাবে এগোলে রাআম ও জয়েন্ট লিস্টের সমর্থন ছাড়াই কার্যকর ও স্থিতিশীল সরকার গঠন করা সম্ভব। তবে কীভাবে এমন সরকার গঠন করা যাবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি তিনি।
এর আগে সোমবার সরকার গঠনের দায়িত্ব আইজেনকটকে দেওয়ার পক্ষে প্রেসিডেন্টের কাছে সুপারিশ করার কথা জানিয়েছিলেন লিবারম্যান। একই সঙ্গে হারেদি বা অতি-অর্থোডক্স ইহুদি দলগুলোর সঙ্গে সরকার গঠনের বিরোধিতা করেছিলেন। তবে সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে এক ব্রিফিংয়ে হারেদি দলগুলোর অংশগ্রহণ নিয়ে আগের মতো কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেননি তিনি। ফলে সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক সেবা থেকে অতি-অর্থোডক্সদের অব্যাহতি দেওয়ার বিরোধিতা করলেও তাদের জোটে নেওয়ার বিষয়ে তাঁর অবস্থান কিছুটা নমনীয় হতে পারে বলে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
বিরোধীরা যখন জোট গঠনের পরিকল্পনা করছে, তখন তাঁদের সমালোচনা করেছেন নেতানিয়াহু। আরব ও অতি-অর্থোডক্স দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার মাধ্যমে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তাঁর দল লিকুদ পার্টি।
দলটির এক বিবৃতিতে বলা হয়, নেতানিয়াহু একটি বিস্তৃত জাতীয় সরকার গঠনের জন্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেও বিরোধীরা সন্ত্রাসবাদের সমর্থকদের ওপর নির্ভরশীল একটি বিপজ্জনক সরকার গঠন করতে চাইছে। গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের মধ্যে এমন সরকার কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দেবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে লিকুদ।
দলটির দাবি, সম্ভাব্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন সদস্য হামাস ও হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দিতেও অনিচ্ছুক। এ ক্ষেত্রে আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট ও রাআমের দিকে ইঙ্গিত করেছে তারা।
তবে বিরোধী নেতারাও নেতানিয়াহুর জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে ও পরে সরকারের ব্যর্থতার জন্য তাঁরা নেতানিয়াহুকে দায়ী করেছেন। তাঁর নেতৃত্বের প্রতি গভীর অনাস্থার কথাও জানিয়েছেন তাঁরা।
অতি-অর্থোডক্স দলগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়েও বিরোধীদের বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ তুলেছেন নেতানিয়াহু। বিরোধীরা সবার জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবার প্রতিশ্রুতি দিলেও লিবারম্যান হারেদি দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি। এ ছাড়া দীর্ঘদিনের নেতানিয়াহু-সমর্থক ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম দল আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন সরকারকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে বলেও খবর প্রকাশিত হয়েছে।
নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর নেতানিয়াহুর সামনে নতুন সরকার গঠনের পথ কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে বিরোধীরাও এখনো প্রয়োজনীয় আসন ও রাজনৈতিক সমঝোতা নিশ্চিত করতে পারেননি। ফলে নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। বিরোধীদের উদ্যোগ সফল না হলে দেশটিতে আবারও নির্বাচন আয়োজনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
সূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল






















