১১:০০ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সরকারের আশ্বাসে আজ কারখানা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত, পরিস্থিতি দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ

Reporter Name
  • Update Time : ১০:০২:৫৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
  • / 3
Print

শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন মালিকেরা। সরকারের অনুরোধ ও নিরাপত্তার আশ্বাসের পর আজ বুধবার (৪ নভেম্বর) কারখানা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা। তবে শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দিলে কিংবা কারখানায় সহিংসতা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

মঙ্গলবার রাতে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের যৌথ বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বিজিএমইএর এক নেতা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) জানান, শুরুতে শ্রম অসন্তোষপ্রবণ এলাকার সব কারখানা একযোগে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার বিষয়ে মালিকেরা একমত হয়েছিলেন। তবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের পরামর্শ ও নিরাপত্তার আশ্বাসের পর বুধবার কারখানা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বুধবার মজুরি বোর্ডের প্রথম বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠক থেকে শ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি ঘোষণার প্রত্যাশাও জানিয়েছেন তিনি।

বিজিএমইএর সহসভাপতি মিজানুর রহমান টিবিএসকে বলেন, বুধবার কারখানা চালু রাখার প্রস্তাব রয়েছে। তবে শ্রমিকেরা কাজে ফিরতে অনীহা প্রকাশ করলে কিংবা অসন্তোষ চলতে থাকলে প্রভাবিত কারখানার মালিকেরা শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে পারবেন।

মিজানুর রহমানের আশা, মজুরি বোর্ডের বৈঠক থেকে শ্রমিক অসন্তোষ নিরসন এবং পরবর্তী কর্মপন্থা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে।

অন্যদিকে মজুরি বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত শ্রমিক প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই শ্রমিকদের জন্য যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য নতুন ন্যূনতম মজুরি ঘোষণার লক্ষ্যে তাঁরা বোর্ডে জোরালো ভূমিকা রাখবেন।

এর আগে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন শুরুর পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় অসন্তোষপ্রবণ এলাকার কারখানাগুলো একযোগে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মালিকেরা। চলতি সপ্তাহের শুরু থেকে আন্দোলন সহিংস রূপ নেওয়ায় উৎপাদন চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। গত রোববার সরকার শ্রমিকদের পাওনা ও বেতন পর্যালোচনায় ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে। তবে এরপরও বিক্ষোভ থামেনি; বরং সোমবার তা সাভার, গাজীপুর ও মিরপুরের নতুন নতুন শিল্প এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

সরকার ও মালিকপক্ষের আহ্বানের পরও মঙ্গলবার ঢাকার মিরপুর, গাজীপুর, আশুলিয়া, হেমায়েতপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় শ্রম অসন্তোষ অব্যাহত ছিল। শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নেন, বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক অবরোধ করেন।

বিজিএমইএর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মিরপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, আশুলিয়া ও জিরাবো এলাকায় ৩০০টির বেশি কারখানায় কাজ বন্ধ রেখে ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। এসব কারখানার প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার শ্রমিক কাজ না করেই কর্মস্থল ত্যাগ করেন।

মিরপুরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনায় মেট্রোরেল চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। আশুলিয়ায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। সাভারের হেমায়েতপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক প্রায় দুই ঘণ্টা অবরোধ করে রাখেন শ্রমিকেরা। গাজীপুরেও বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের চেষ্টা হয়।

নারায়ণগঞ্জেও শ্রম অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানান, শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমে আসায় জেলার ২৫ থেকে ৩০টি বড় পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। এসব কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় এক লাখ।

এদিকে চলমান অস্থিরতার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে রপ্তানি কার্যাদেশেও। পোশাকশিল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, কয়েকটি আন্তর্জাতিক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের কাছে পরিস্থিতির সর্বশেষ অবস্থা জানতে চেয়েছে। কোনো কোনো বিদেশি ক্রেতা তাদের প্রাথমিক প্রতিশ্রুতির তুলনায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কার্যাদেশ বাতিল বা কমিয়ে দিয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তা শোভন ইসলাম জানান, কিছু আন্তর্জাতিক ক্রেতা পূর্বনির্ধারিত ক্রয়াদেশের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম পণ্যের চূড়ান্ত অর্ডার দিচ্ছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এসব অর্ডার অন্য দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তিনি।

ঢাকায় ইউরোপীয় একটি ফ্যাশন ব্র্যান্ডের আঞ্চলিক কার্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী দুই মাসে বাংলাদেশ থেকে তাদের নির্ধারিত অর্ডারের পরিমাণ কমানো হবে।

সব মিলিয়ে বুধবার কারখানা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হলেও শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি এবং মজুরি বোর্ডের বৈঠকের দিকেই এখন নজর পোশাকশিল্পসংশ্লিষ্টদের।

Please Share This Post in Your Social Media

সরকারের আশ্বাসে আজ কারখানা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত, পরিস্থিতি দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ

Update Time : ১০:০২:৫৪ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
Print

শ্রমিক অসন্তোষের মধ্যে পোশাক কারখানা অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন মালিকেরা। সরকারের অনুরোধ ও নিরাপত্তার আশ্বাসের পর আজ বুধবার (৪ নভেম্বর) কারখানা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা। তবে শ্রমিকেরা কাজে যোগ না দিলে কিংবা কারখানায় সহিংসতা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকেরা বন্ধের সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

মঙ্গলবার রাতে তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের যৌথ বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

বিজিএমইএর এক নেতা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে (টিবিএস) জানান, শুরুতে শ্রম অসন্তোষপ্রবণ এলাকার সব কারখানা একযোগে অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার বিষয়ে মালিকেরা একমত হয়েছিলেন। তবে সরকারের উচ্চপর্যায়ের পরামর্শ ও নিরাপত্তার আশ্বাসের পর বুধবার কারখানা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বুধবার মজুরি বোর্ডের প্রথম বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ওই বৈঠক থেকে শ্রমিকদের নতুন ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া যেতে পারে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন মজুরি ঘোষণার প্রত্যাশাও জানিয়েছেন তিনি।

বিজিএমইএর সহসভাপতি মিজানুর রহমান টিবিএসকে বলেন, বুধবার কারখানা চালু রাখার প্রস্তাব রয়েছে। তবে শ্রমিকেরা কাজে ফিরতে অনীহা প্রকাশ করলে কিংবা অসন্তোষ চলতে থাকলে প্রভাবিত কারখানার মালিকেরা শ্রম আইনের ১৩(১) ধারা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে পারবেন।

মিজানুর রহমানের আশা, মজুরি বোর্ডের বৈঠক থেকে শ্রমিক অসন্তোষ নিরসন এবং পরবর্তী কর্মপন্থা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে।

অন্যদিকে মজুরি বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত শ্রমিক প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই শ্রমিকদের জন্য যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য নতুন ন্যূনতম মজুরি ঘোষণার লক্ষ্যে তাঁরা বোর্ডে জোরালো ভূমিকা রাখবেন।

এর আগে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন শুরুর পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় অসন্তোষপ্রবণ এলাকার কারখানাগুলো একযোগে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মালিকেরা। চলতি সপ্তাহের শুরু থেকে আন্দোলন সহিংস রূপ নেওয়ায় উৎপাদন চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। গত রোববার সরকার শ্রমিকদের পাওনা ও বেতন পর্যালোচনায় ছয় সদস্যের নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে। তবে এরপরও বিক্ষোভ থামেনি; বরং সোমবার তা সাভার, গাজীপুর ও মিরপুরের নতুন নতুন শিল্প এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

সরকার ও মালিকপক্ষের আহ্বানের পরও মঙ্গলবার ঢাকার মিরপুর, গাজীপুর, আশুলিয়া, হেমায়েতপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় শ্রম অসন্তোষ অব্যাহত ছিল। শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নেন, বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক অবরোধ করেন।

বিজিএমইএর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মিরপুর, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, আশুলিয়া ও জিরাবো এলাকায় ৩০০টির বেশি কারখানায় কাজ বন্ধ রেখে ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। এসব কারখানার প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার শ্রমিক কাজ না করেই কর্মস্থল ত্যাগ করেন।

মিরপুরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনায় মেট্রোরেল চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। আশুলিয়ায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের দফায় দফায় সংঘর্ষ ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। সাভারের হেমায়েতপুরে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক প্রায় দুই ঘণ্টা অবরোধ করে রাখেন শ্রমিকেরা। গাজীপুরেও বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের চেষ্টা হয়।

নারায়ণগঞ্জেও শ্রম অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান জানান, শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমে আসায় জেলার ২৫ থেকে ৩০টি বড় পোশাক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। এসব কারখানায় শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় এক লাখ।

এদিকে চলমান অস্থিরতার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে রপ্তানি কার্যাদেশেও। পোশাকশিল্পসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, কয়েকটি আন্তর্জাতিক ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের কাছে পরিস্থিতির সর্বশেষ অবস্থা জানতে চেয়েছে। কোনো কোনো বিদেশি ক্রেতা তাদের প্রাথমিক প্রতিশ্রুতির তুলনায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কার্যাদেশ বাতিল বা কমিয়ে দিয়েছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।

পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তা শোভন ইসলাম জানান, কিছু আন্তর্জাতিক ক্রেতা পূর্বনির্ধারিত ক্রয়াদেশের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম পণ্যের চূড়ান্ত অর্ডার দিচ্ছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এসব অর্ডার অন্য দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তিনি।

ঢাকায় ইউরোপীয় একটি ফ্যাশন ব্র্যান্ডের আঞ্চলিক কার্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় আগামী দুই মাসে বাংলাদেশ থেকে তাদের নির্ধারিত অর্ডারের পরিমাণ কমানো হবে।

সব মিলিয়ে বুধবার কারখানা খোলা রাখার সিদ্ধান্ত হলেও শিল্পাঞ্চলের পরিস্থিতি এবং মজুরি বোর্ডের বৈঠকের দিকেই এখন নজর পোশাকশিল্পসংশ্লিষ্টদের।