যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণ হবে যেভাবে
- Update Time : ১০:৩২:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
- / 5

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছর কেমন যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে দেশটির মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফলের ওপর। আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ভোটাররা কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ ও উচ্চকক্ষ সিনেটের সদস্য নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন। নির্বাচনে রিপাবলিকানরা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবেন, নাকি ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা ফিরিয়ে আনবেন—সেদিকেই নজর এখন সবার।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গভর্নর, আইনসভা ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন পদেও নির্বাচন হচ্ছে। তবে জাতীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। বর্তমানে দুই কক্ষেই রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে চাইছেন।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দলের আসন হারানোর প্রবণতা দীর্ঘদিনের। সাধারণত প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারের নীতির প্রতি ভোটারদের সন্তুষ্টি নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলে। এবার ট্রাম্পের জনসমর্থন, মূল্যস্ফীতি এবং ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাত নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণ হবে ৪৩৫ আসনে
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যসংখ্যা ৪৩৫। প্রত্যেক সদস্য দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হন। তাই প্রতি দুই বছর পরপর এই কক্ষের সব আসনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এবারও ৪৩৫টি আসনে ভোট হচ্ছে।
প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে কোনো দলকে অন্তত ২১৮টি আসন নিশ্চিত করতে হবে। বর্তমানে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা খুব বেশি নয়। ফলে অল্প কয়েকটি আসনের ফলও কক্ষটির নিয়ন্ত্রণ বদলে দিতে পারে।
নির্বাচনের সব আসনে সমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই। অনেক এলাকায় একটি দলের সমর্থন এতটাই শক্তিশালী যে সেখানে অন্য দলের প্রার্থীর জয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। ফলে নির্বাচনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলো।
কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের বিশ্লেষণে প্রতিনিধি পরিষদের কয়েক ডজন আসনকে প্রতিযোগিতাপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু আসনকে দুই দলের প্রার্থীর জন্যই কঠিন লড়াইয়ের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব আসনের ফলই শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের নিম্নকক্ষের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
ইতিহাসেও মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্টের দলের জন্য চ্যালেঞ্জের নজির রয়েছে। ১৯৩৪ সাল থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল প্রতিনিধি পরিষদে গড়ে ২৭টি আসন হারিয়েছে। ফলে এবারও রিপাবলিকানদের আসন হারানোর আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণে ডেমোক্র্যাটদের কঠিন সমীকরণ
কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটের সদস্যসংখ্যা ১০০। সিনেটররা ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন। প্রতি দুই বছর পরপর সাধারণত এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন হয়। এবার নিয়মিত নির্বাচনের পাশাপাশি দুটি বিশেষ নির্বাচন মিলিয়ে ৩৫টি আসনে ভোট হচ্ছে।
সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে সাধারণত ৫১টি আসন প্রয়োজন। তবে আসনসংখ্যা ৫০-৫০ হলে ভাইস প্রেসিডেন্টের ভোটে সমতা ভাঙার সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে রিপাবলিকানদের হাতে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে ভোট দেন দুজন স্বতন্ত্র সিনেটর। ডেমোক্র্যাটদের নিজস্ব আসনসংখ্যা ৪৫।
এই সমীকরণে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের অন্তত চারটি আসন বাড়াতে হবে এবং নিজেদের দখলে থাকা আসনগুলো ধরে রাখতে হবে। ফলে প্রতিনিধি পরিষদের তুলনায় সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া তাদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ।
আলাস্কা, আইওয়া, কানসাস, মেইন, মিশিগান, ওহাইও ও টেক্সাসের মতো অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এসব রাজ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াইয়ের কারণে ফলাফল সিনেটের দলীয় ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
মিশিগানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদ ও রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের লড়াই আলোচনায় রয়েছে। টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট জেমস টালারিকোর মুখোমুখি রিপাবলিকান কেন প্যাক্সটন। এ ছাড়া আলাস্কা, আইওয়া ও ওহাইওর মতো রাজ্যেও দুই দলের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে।
ভোটারদের উদ্বেগে জীবনযাত্রার ব্যয় ও ইরান সংঘাত
এবারের নির্বাচনে ভোটারদের সিদ্ধান্তে জীবনযাত্রার ব্যয় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্প মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু জ্বালানি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ে অসন্তোষ তাঁর দলের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাতও নির্বাচনী আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিবাজারে পড়েছে। গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা সাধারণ মানুষের ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি করেছে।
এ ছাড়া স্বাস্থ্যসেবা ও অভিবাসনও নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। ট্রাম্প প্রশাসন সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অভিবাসন কমানোর বিষয়টিকে নিজেদের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা স্বাস্থ্যবিমার ব্যয়, চিকিৎসাসেবার সুযোগ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সংকটকে প্রচারণায় গুরুত্ব দিচ্ছেন।
নির্বাচনী প্রচারণায় অর্থের প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে প্রচারণার অর্থায়নও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রাজনৈতিক দল, প্রার্থী এবং তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো বিজ্ঞাপন, প্রচারসভা ও ভোটারদের কাছে বার্তা পৌঁছে দিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে।
এবারের নির্বাচনে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—দুই দলই গুরুত্বপূর্ণ আসনগুলোতে প্রচারণা জোরদার করেছে। বিশেষ করে যেসব আসনে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান কম হতে পারে, সেখানে টেলিভিশন, অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচারে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নির্বাচনী অর্থায়নের পাশাপাশি ভোটার উপস্থিতিও ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ। আগাম ভোট ও ডাকযোগে ভোটের পর মঙ্গলবারের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচনের চূড়ান্ত হিসাব তৈরি হবে। কোন দলের সমর্থকেরা বেশি সংখ্যায় ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হচ্ছেন, তা ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
নির্বাচনের ফল কীভাবে প্রভাব ফেলবে ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্প প্রশাসনের আইন প্রণয়ন ও নীতিগত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন তুলনামূলক সহজ হবে। বাজেট অনুমোদন, নতুন আইন পাস এবং প্রশাসনের বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নে দলটি সুবিধা পাবে।
অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ বা সিনেটের যেকোনো একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য আইন প্রণয়নের পথ কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কংগ্রেসের কমিটিগুলোর নেতৃত্ব, সরকারি ব্যয় ও প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারির ক্ষেত্রেও ডেমোক্র্যাটরা বেশি ক্ষমতা পাবেন।
দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণই ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেলে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে কংগ্রেসের বিরোধ আরও বাড়তে পারে। গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস, বাজেট ও প্রশাসনিক নিয়োগের ক্ষেত্রে দুই পক্ষের সমঝোতা প্রয়োজন হবে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগেও দুই দলের রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। তাই এবারের ভোট শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যা নির্ধারণের নির্বাচন নয়; ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি কেমন হবে, তারও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।






















